Category: তারাবীহ

  • আজকের তারাবীহ: ৭ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ৭ রমাদ্বান

    ০৮। সূরা আনফাল, আয়াত ৪১ থেকে ৭৫

    গনীমতের মাল বণ্টনের নিয়ম বর্ণিত হয়।

    বদরের দুই দল আলোচনা করে যুদ্ধের তারিখ ঠিক করতে গেলে উভয় দলই মতভেদ করত। আল্লাহ তাঁর নির্ধারিত সময়েই যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছেন। যেন যাদের ধ্বংস হওয়ার, তারা সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখেই ধ্বংস হয়; আর যাদের বেঁচে থাকার, তারাও সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখেই বেঁচে থাকে।

    আল্লাহর ইচ্ছায় উভয় দল পরস্পরকে চোখের দেখায় কম সংখ্যক দেখছিল। ফলে মুমিনদের সাহস বাড়ে, আর কাফিরদের অহংকার ও অসাবধানতা বাড়ে।

    যুদ্ধের সময় অধিক যিকির করতে এবং কুরআন সুন্নাহর অনুগামিতা করতে বলা হয়। অন্তঃকলহ করতে নিষেধ করা হয়। কাফিরদের মতো অহংকারের সহিত লোক দেখানো ধাঁচের যুদ্ধ মহড়া না করতে বলা হয়।

    শয়তান কাফিরদেরকে যুদ্ধের ব্যাপারে খুব উৎসাহ দিয়েছিল। ময়দানে এসে ফেরেশতাদের দেখে সে তার বন্ধু কাফিরদের ফেলে পলায়ন করে।

    কুরাইশ মুশরিকদের ফিরআউনের সাথে তুলনা করা হয়। উভয় অহংকারী দলই শক্তি ও সংখ্যায় বেশি হয়েও লাঞ্ছিত হয়েছে। এটা তাদের নিজেদেরই দোষ। কাফিররাই আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম জীব।

    চুক্তি ভঙ্গকারী শত্রু জাতি ও বিশ্বাসঘাতকদের সাথে সমুচিত আচরণ করতে বলা হয়।

    জানা-অজানা শত্রুদের মনে ভীতি সঞ্চার করার লক্ষ্য মুমিনদের যথাসাধ্য সামরিক শক্তি অর্জন করতে বলা হয়। আর কোনো শত্রুজাতি শান্তিচুক্তি করতে চাইলে তা করতে বলা হয়। এটা করে তারা যদি ধোঁকা দিতে চায়, তাহলে তা উন্মোচন করার জন্য আল্লাহ আছেন।

    প্রচণ্ড গোত্রীয় চেতনাবাদী আরব সমাজে আল্লাহ কীভাবে মুমিনদের মাঝে দ্বীনি সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন তা স্মরণ করানো হয়।

    প্রাথমিকভাবে মুসলিম ও কাফিরের যুদ্ধ শক্তির অনুপাত ১:১০ হলেও যুদ্ধ ছেড়ে পলায়ন না করে যুদ্ধ করতে বলা হয়, এতেই মুসলিমরা আল্লাহর ইচ্ছায় সফল হবে। পরে বিধান সহজ করে ১:২ করা হয়।

    শত্রুর শক্তি একেবারে চূর্ণ করার আগ পর্যন্ত তাদের হত্যা না করে বন্দী করা আল্লাহর পছন্দ নয়। বদরের বন্দীদের হত্যা না করে মুক্তিপণ আদায় করার কারণে আল্লাহ কড়া ধমকি দেন। কিন্তু সেই সাথে মাফও করে দেন এবং যা অর্থ অর্জিত হয়েছে, তা নিশ্চিন্তে ভোগ করার অনুমতি দেন। আর সেসকল কাফিরদের অন্তরে যদি আল্লাহ ঈমান আনার ইচ্ছা দেখেন, তাহলে তাদের এই মুক্তিপণ বাবদ সম্পদের ক্ষতিকে তিনি এর চেয়েও উত্তম জিনিস দিয়ে ক্ষতিপূরণ করে দিবেন।

    যারা তখনও হিজরত করেনি, তাদের সাথে সম্পদের উত্তরাধিকারের বিধান এবং কাফির গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাদের সহায়তার বিধান বর্ণিত হয়।

    যাঁরা ঈমান আনার পর হিজরত ও জিহাদ করেছেন এবং যাঁরা তাঁদের আশ্রয় দিয়েছেন (আনসার), তাঁদেরকে সাচ্চা মুমিন আখ্যায়িত করে ক্ষমা ও উত্তম রিযিকের ওয়াদা করা হয়।

    ০৯। সূরা তাওবাহ, আয়াত ১ থেকে ৯২

    সূরা তাওবাহর বক্তব্য অনেকটা সূরা আনফালের মতোই। আরবের অনেক লোক মুসলিম ও মুশরিকদের মাঝে যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি দেখার অপেক্ষায় ছিল। মুসলিমদের মক্কা বিজয় ও হুনাইন যুদ্ধ জয়ের পর সমগ্র আরবের এসব লোকদের ইসলাম গ্রহণের পথে আর বাধা রইল না। এমতাবস্থায় আরব উপদ্বীপকে ইসলামের কেন্দ্র ঘোষণার্থে সেখানে অমুসলিমদের স্বাধীন নাগরিকত্ব নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রয়োজন দেখা দেয়। যুদ্ধরত নয় এমন মুশরিকদের যাদের সাথে এমন চুক্তি ছিল যার মেয়াদ নির্ধারিত হয়নি, তাদের চার মাস সময় দেওয়া হয়। এর মাঝে ইসলাম গ্রহণ না করলে আরব উপদ্বীপ ছেড়ে চলে যাবে। আর যাদের সাথে মেয়াদ নির্ধারিত আছে, তাদের সাথে মেয়াদ পূর্ণ করা হবে। তারপরও তারা মুসলিম না হলে বা আরব উপদ্বীপ ছেড়ে না গেলে যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই হত্যা করা হবে। এসকল মুশরিকেরা মুসলিমদের বাগে পেলে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক বা ন্যায়-অন্যায়ের মূল্য দেয় না। তাদের সাথে অনুরূপ আচরণের হুকুম করা হয়। তারপর কিছু শর্ত বর্ণিত হয়, যেখানে তাদের হত্যা না করে নিরাপত্তা দিতে হবে। যেমন- ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হওয়া।

    মুশরিকরা কাবার রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে গর্ব করত। মূর্তিপূজকরা যে এ দায়িত্বের অযোগ্য, তা ঘোষণা করা হয়।

    আত্মীয়-ঘরবাড়ি-সম্পদের চেয়ে জিহাদকে অধিক ভালোবাসতে বলা হয়। আপন আত্মীয়ও যদি কাফির হয়, তাদেরও অভিভাবক বানানো যাবে না।

    হুনাইনের যুদ্ধের দিন মুসলিমরা নিজেদের সংখ্যাধিক্য দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিলো। ফলে প্রাথমিকভাবে পরাজয় বরণ করে। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের পুনঃসংগঠিত করে আক্রমণের সুযোগ দিয়ে বিজয় দেন। এই নিয়ামাতের কথা স্মরণ করানো হয়।

    আহলে কিতাবগণের ওপর জিযিয়ার বিধান আরোপ করা হয়। তাদের ভ্রান্ত ধর্মীয় বিশ্বাসগুলো তিরস্কার করা হয়। যেমন- আল্লাহর সন্তান আছে বলে বিশ্বাস করা এবং পীর-দরবেশদেরকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করা। তাদের অন্যায়ভাবে সম্পদ কুক্ষিগত করার কাজকেও তিরস্কার করা হয়।

    মুশরিকরা নিজ সুবিধার্থে পবিত্র মাসসমূহ আগপিছ করে বছর হিসাব করত। এটিকে তিরস্কার করা হয়।

    এরপর রোমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিতব্য তাবূক যুদ্ধের বিভিন্ন দিক বর্ণনা শুরু হয়। সংখ্যার স্বল্পতা, আসবাবের অভাব, বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও জিহাদে বের হতে নানাভাবে উৎসাহিত করা হয়।

    মুনাফিকদের কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়। জিহাদের ইচ্ছা যদি তাদের থাকতই তাহলে কিছু না কিছু প্রস্তুতি নিত। কিন্তু তারা জিহাদে গেলে বিশৃঙ্খলাই করবে। তাই আল্লাহই তাদের ঘরে বসিয়ে রেখেছেন।

    তারা অনেকে আজগুবি সব অজুহাত দিত। এক মুনাফিক আরজ করেছিল রোমান নারীদের দেখলে সে ফিতনায় পড়ে যাবে, তাই তাকে জিহাদে না যাওয়ার অনুমতি দেয়া হোক। আল্লাহ বলেন জিহাদে না গিয়ে বসে থাকাটাই ফিতনা।

    মুসলিমদের ওপর বিপদ এলে মুনাফিকরা ভাবে যে তারা বেঁচে গেল। অথচ তাকদিরে থাকা বিপদ আসবেই। মুমিনরা তো হয় জয়ী হবে নয়তো শহীদ হবে, আর মুনাফিকরা হয় আল্লাহর হাতে সরাসরি বা মুমিনদের হাত দিয়ে শাস্তি পাবে।

    তারা কেউ কেউ টাকা দিয়ে শারীরিক জিহাদ থেকে অব্যাহতি চায়। আর মুমিনদের মধ্যে কেউ সদকা দিলে তাকে লোক দেখানো বলে উপহাস করে। কেউ দারিদ্র্যের কারণে কিছু দিতে না পারলে তাকেও উপহাস করে। আল্লাহ বলেন মুনাফিকদের দানই বরং কবুল হয় না। মুমিনরা ঠিকই সাওয়াব পায়।

    যাকাতের খাতসমূহ বর্ণিত হয়।

    রাসূল (সাঃ) সকলের কথা বিশ্বাস করেন, এমন মন্তব্য করে মুনাফিকরা খুশি হয় এই ভেবে যে তাঁকে তারা সহজেই প্রতারিত করছে।  আল্লাহ এই ধারণা খণ্ডন করে দেন যে তিনি তাঁর রাসূলকে ঠিকই সব গোপন চক্রান্ত জানিয়ে দেন।

    নিজেদের মুসলিম দাবি করার পরও মুনাফিকরা কাফিরসুলভ কথাবার্তা বলে। জিজ্ঞেস করলে বলে ঠাট্টা করছিল। এটাকেও কুফরি আখ্যায়িত করা হয়।

    মুনাফিক নারী-পুরুষদের তিরস্কার করে তাদের পূর্বেকার জাতিসমূহের সীমালঙ্ঘনকারীদের সাথে তুলনা করা হয়। মুমিন নারী-পুরুষদের প্রশংসা করে জান্নাতের ওয়াদা করা হয়।

    কাফিরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে মৌখিক জিহাদ করতে বলা হয়। তাদের প্রতি কঠোর হতে বলা হয়।

    গরমের ভয়ে জিহাদ না করতে চাওয়ার মানসিকতা খণ্ডন করে বলা হয় জাহান্নাম এরচেয়েও উত্তপ্ত।

    মুনাফিকদের মৃত্যুতে জানাযা পড়তে রাসূলকে (সাঃ) নিষেধ করা হয়।

    মুনাফিকরা যারা জিহাদে যেতে চায় না আর মুমিনদের যারা সামর্থ্য না থাকায় জিহাদে যেতে পারে না, তাদের পার্থক্য দেখানো হয়। শেষোক্ত দলের কোনো দোষ নেই। কাফির-মুনাফিকদের সম্পদের প্রাচুর্য বরং তাদের প্রতি আযাব। এগুলো তাদেরকে কুফরে অটল রেখে কুফরির ওপরই মৃত্যুবরণ করায়।

  • আজকের তারাবীহ: ৬ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ৬ রমাদ্বান

    ০৭। সূরা আ’রাফ

    বিশুদ্ধ তাওহীদের প্রতি ঈমান আনতে বলা হয়। পূর্বের জাতিসমূহ সীমালঙ্ঘন করার পর তাদের কাছে অকস্মাৎ আযাব এসেছে, রাতে বা দুপুরে বিশ্রামের সময়। তখন তারা আর ঈমান আনার সুযোগ পায়নি। কিয়ামতের দিন উম্মাত এবং রাসূলগণ উভয়পক্ষই নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। আমলনামা ওজন করা হবে। অস্বীকারকারীদের মীযানের পাল্লা হালকা হবে।

    ইবলীস অহংকারের কারণে আদাম (আঃ)-কে সেজদা করার হুকুম অমান্য করে। ফলে সে অভিশপ্ত হয়। সে আল্লাহর কাছে কিয়ামাত পর্যন্ত হায়াত চায়, যেন মানুষদের চারদিক থেকে পথভ্রষ্ট করতে পারে। আল্লাহ তার এই দু’আ কবুল করে তার অনুসারীদেরসহ তাকে দিয়ে জাহান্নাম পরিপূর্ণ করার ওয়াদা করেন।

    আদাম-হাওয়া (আঃ)-কে জান্নাতে রেখে তাঁদের একটি গাছের নিকটবর্তী হতে মানা করা হয়। শয়তান একদিন তাঁদের প্ররোচিত করে। কসম করে নিজেকে কল্যাণকামী দাবি করে। ওই গাছটির ফলের স্বাদ নিলে তাঁরা অমর বা ফেরেশতা হয়ে যাবেন, তাই আল্লাহ এটি খেতে নিষেধ করেছেন বলে দাবি করে। তার কথামতো কাজ করার পর তাঁদের লজ্জাস্থান উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। আল্লাহ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাঁরা ইবলীসের মতো অহংকার না করে মাফ চান। আল্লাহ তাঁদের মাফ করে সকলকে জমিনে পাঠিয়ে দেন সাময়িক জিন্দেগির পরীক্ষাস্বরূপ।

    আল্লাহ আমাদের সাবধান করে দেন যে, শয়তান যেভাবে আমাদের পূর্বপুরুষদের উলঙ্গ করেছে, আমাদেরকেও যেন সেভাবে প্ররোচিত করে অশ্লীলতার দিকে নিতে না পারে। মূলত মুশরিকরা যে উলঙ্গ হয়ে কাবা তাওয়াফ করত, তার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। লজ্জা নিবারণ ও সৌন্দর্যের জন্য আল্লাহর দেওয়া পোশাক পরতে বলা হয়। আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম। সালাতে যাওয়ার সময় সাজসজ্জা গ্রহণ করতে বলা হয়। খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করতে বলা হয়, অপচয় করতে নিষেধ করা হয়।

    দুনিয়াতে মুমিনরা আল্লাহর দেওয়া হালাল দ্রব্যাদি নিশ্চিন্তে ব্যবহার করবে। আর আখিরাতের নিয়ামতও বিশেষভাবে মুমিনদেরই জন্য। মুশরিকরা যেসব মনগড়া হারামের বিধান নিজেদের উপর চাপিয়েছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। আসল হারাম হলো শির্ক, অন্যের প্রতি সীমালঙ্ঘন, প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা।

    কিয়ামাতের দিন সব যুগের কাফিররা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তারা একে অপরকে দোষারোপ করবে এবং একজন আরেকজনের জন্য দ্বিগুণ আযাবের দু’আ করবে। মিথ্যা উপাস্য ও নেতৃবর্গ সেদিন তাদের সাহায্য করবে না। মুমিনরা জান্নাতে মিলেমিশে থাকবে। তাদের মনের দুঃখ-কষ্ট, শত্রুতা ভুলিয়ে দেয়া হবে। আর যেসব ঈমানদারের গুনাহ ও নেকি সমান, তারা আরাফে ঘোরাফেরা করবে। একবার জান্নাতিদের দেখে সালাম দিবে, একবার জাহান্নামিদের তিরস্কার করবে (আরাফবাসীরাও পরে জান্নাতে যাবে)। জাহান্নামীরা জান্নাতিদের অনুরোধ করবে এক ফোঁটা পানি হলেও তাদের ওপর ফেলতে। জান্নাতিরা বলবে যে এই দিনে এসব নিয়ামত কাফিরদের উপর হারাম।

    আল্লাহর বিভিন্ন সৃষ্ট নিদর্শনের কথা বর্ণনা করে দেখানো হয় কীভাবে দুনিয়াতেই মৃত থেকে জীবিত ও জীবিত থেকে মৃতকে বের করা হচ্ছে। অতএব আখিরাতের অস্তিত্ব অসম্ভব কিছু নয়।

    নূহ, হুদ, সালিহ, লূত ও শুআইব (আলাইহিমুসসালাম) নবীগণের ঘটনা সংক্ষেপে পরপর বলা হয়। সকল ক্ষেত্রেই লক্ষণীয় বিষয় হলো- তাঁদের সম্প্রদায়গুলোর কমন সমস্যা ছিল শির্ক। শির্কের পাশাপাশি একেক কওমের একেক সমস্যা ছিল। অহংকার, অত্যাচার, সমকামিতা ও ওজনে কমবেশি করার মতো গুনাহে তারা লিপ্ত ছিল। নবীগণ তাওহীদের দাওয়াত দিলে সকল ক্ষেত্রেই দুর্বল লোকেরা কথা শুনত। আর সমাজের রুইকাতলারা বিরোধিতা করত। পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ ধরে রাখতে চাওয়া, মু’মিনদের পবিত্রতা কামনাকে নিয়ে ঠাট্টা করা, এবং নবী ও তাঁর অনুসারীদেরকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চাওয়ার মতো জঘন্য অপরাধ তারা করেছে। নবীর পথ অনুসরণ করলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে, এমন কথা বলে তারা মানুষকে হিদায়াত থেকে ফিরিয়ে রাখতো। তারা মু’জিযা দেখানোর আবদার করত। অথচ মু’জিযা দেখেও ঈমান আনতো না। সকল জাতিকেই সংকট ও প্রাচুর্য দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। সীমালঙ্ঘন করার ফলে অবশেষে আচমকা এমন সময়ে আযাব এসেছে যে একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায় পুরো জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। কেবল সংশ্লিষ্ট নবী ও তাঁর মুষ্টিমেয় অনুসারীরা রক্ষা পেয়েছেন।

    মূসা (আঃ) এর ঘটনা বিস্তারিত বলা হয়েছে। ফিরআউনকে মু’জিযা দেখানোর পরও সে ঈমান আনতে ও জুলুম থেকে নিবৃত হতে অস্বীকার করে। রাজ্যের জাদুকরদের সাথে মূসার (আঃ) প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। জাদুকররা মোকাবেলার সময় তাদের জাদু (দৃষ্টিবিভ্রম) ও মূসার মু’জিযার (বাস্তবিক অতিপ্রাকৃত ঘটনা) পার্থক্য বুঝতে পেরে ঈমান আনে। ফিআউন ক্রোধে দিশা হারিয়ে ফেলে একে ষড়যন্ত্র আখ্যায়িত করে এবং বনী ইসরাইলকে অত্যাচার করতে থাকে। ফিরআউনের কওমের ওপর ভয়ংকর কিছু আযাব পরপর আসে। বন্যা, পঙ্গপাল, উকুন বা ঘুনপোকা, ব্যাঙ ও রক্ত। প্রতিবারাই তারা মূসার কাছে এসে আল্লাহর কাছে মাফ চাইতে অনুরোধ করে ঈমান আনার অঙ্গিকার করে। আযাব সরে যাওয়ার পর আবার ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে। অবশেষে বনী ইসরাইলকে ধাওয়া করার সময় ফিরআউন ও তার লস্কর লোহিত সাগরে ডুবে মরে।

    শাম-ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের সীমায় নিরাপদে প্রবেশ করার পর বনী ইসরাইল ও মূসা-হারুন (আঃ) এর বিচিত্র ঘটনা শুরু হয়। এতদিন আল্লাহর এত নিয়ামাত দেখেও দাসত্বমনা বনী ইসরাইল জাতি অন্য এক জাতিকে মূর্তিপূজা করতে দেখে মূসাকে অনুরোধ করে ওদের জন্যও একটা পূজার মূর্তি বানিয়ে দিতে। মূসা (আঃ) এর নসিহতে তারা নিবৃত হয়।

    মূসা (আঃ)-কে তাওরাত দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাঁকে তূর পাহাড়ে ডেকে নেন। তিনি আল্লাহকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তূর পাহাড়ে আল্লাহ তাজাল্লী নিক্ষেপ করলে মূসা (আঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফেরার পর তিনি আল্লাহর ক্ষমতা ও নিজের আবদারের পার্থক্য উপলব্ধি করে ক্ষমা চান। ফলকে লেখা তাওরাত নিয়ে তিনি ফেরত আসেন।

    এদিকে মূসার (আঃ) অনুপস্থিতিতে হারুন (আঃ) বনী ইসরাইলের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তারা তাঁকে অমান্য করে এক জাদুকরের বানানো স্বর্ণের বাছুরের উপাসনা শুরু করে। মূসা (আঃ) ফিরে এসে আবারও নসিহত করে তাদের নিবৃত করেন। এভাবেই উম্মাতকে সরলপথে ধরে রাখতে নবীগণ অনেক কষ্ট করেছেন। আবার বারবার ভুল করার পরও উম্মাতদের আল্লাহ বারবার মাফ করে বারবার সুযোগ দিয়েছেন। তাওরাত-ইঞ্জিলের এসব ঘটনা একজন নিরক্ষর ব্যক্তি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করছেন, এটাও মুহাম্মাদ (সাঃ) এর নবুওয়তের একটি প্রমাণ।

    সুপেয় পানি এবং সহজলভ্য খাবার (মান্না ও সালাওয়া) পাওয়ার মতো নিয়ামাত লাভের পরও বনী ইসরাইল পরবর্তীতে আল্লাহর আদেশ এবং কিতাব বিকৃত করে। সপ্তাহে একদিন শনিবারে কাজকর্ম করা নিষিদ্ধ থাকার মতো সহজ বিধান অমান্য করে সেদিন তারা মাছ ধরত। কিছু লোক নিজেরা না ধরলেও, যারা ধরত তাদের হিদায়াতের ব্যাপারে হতাশ হয়ে তাদেরকে মানা করা ছেড়ে দিয়েছিল। কিছু লোক নিজেরাও এ কাজ থেকে বিরত থাকত, অন্যদেরও তা হতে নিষেধ করত। প্রথমোক্ত দলটিকে আল্লাহ আযাব দিয়ে বানরে পরিণত করে দেন। তার পর থেকে কিয়ামতের আগ পর্যন্ত ইহুদিরা অভিশপ্ত জাতি।

    এছাড়াও আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের আলেমরা ঘুষের বিনিময়ে মানুষের সুবিধামতো কিতাব বিকৃত করত।

    রুহের জগতে থাকা অবস্থায় আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে সাক্ষ্য নিয়েছেন যে তিনিই আমাদের রব্ব। অতএব, বাপদাদাকে শির্ক করতে দেখাটা শির্ক করার জন্য কোনো অজুহাত নয়।

    অর্থের লোভে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করা এক বনী ইসরাইলীয়র উদাহরণ পেশ করে আল্লাহ তাকে কুকুরের সাথে তুলনা দেন। সুস্থ অন্তর, চোখ ও কানের যথার্থ ব্যবহার না করে হিদায়াত থেকে দূরে থাকা জাহান্নামী মানুষ এবং জ্বীনদেরকেও চতুষ্পদ জন্তুর সাথে তুলনা করা হয়।

    মুশরিকরা আল্লাহর ওপর এমন বৈশিষ্ট্য আরোপ করত, যা তাঁর বৈশিষ্ট্য নয়। আবার এমন বৈশিষ্ট্য অস্বীকার করত যা আসলে আল্লাহর বৈশিষ্ট্য। তাই আল্লাহকে তাঁর সুন্দরতম গুণবাচক নামসমূহ ধরে ডাকতে আদেশ করা হয়।

    মূর্তিপূজার অসারতা বর্ণনা করে আল্লাহর ইবাদাত ও যিকিরের কিছু সুন্দর পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়।

    ০৮। সূরা আনফাল, আয়াত ১ থেকে ৪০

    সূরা আনফাল নাযিল হয় মূলত বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। যুদ্ধ জয়ের পর মুসলিমদের একাংশ রাসূল (সাঃ) এর রক্ষণাবেক্ষণে দাঁড়িয়ে যায়, একাংশ শত্রুদের ধাওয়া করে, একদল গনীমত সংগ্রহ করে। তিন দলেরই ধারণা ছিলো তারা নিজেরাই গনীমতের বেশি হকদার। কারণ বদর ছিলো প্রথম যুদ্ধ এবং গনীমতের বিধান তখনও নাযিল হয়নি। এ নিয়ে তাঁদের মাঝে মনোমালিন্য বেঁধে যায়।

    আল্লাহ ওয়াহী নাযিল করে জানিয়ে দেন যে গনীমত কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। এভাবে তাঁদের মনে চলে আসা সম্পদের টান দূর করে মন নরম করে ফেলা হয়। উল্লেখ্য আনফাল অর্থ বোনাস। গনীমতের জন্য আনফাল কথাটা ব্যবহার করে বুঝিয়ে দেওয়া হয় এটি না পেলে আফসোসের কিছু নেই, আর পেলে তো উপরি পাওনা।

    দিল নরম করার পর দীর্ঘ নসিহত করা হয়। যুদ্ধাবস্থায়/যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মুসলিমরা যেন পিছু না হটে। যুদ্ধজয়কে মুসলিমরা যেন নিজেদের কৃতিত্ব না ভাবে। কাফিরদেরকে মুসলিমরা নিজ শক্তিতে মারেনি, বরং আল্লাহই মেরেছেন। যুদ্ধের আগের রাতে প্রশান্তির ঘুম ও বৃষ্টি দিয়ে আল্লাহ সাহায্য করেছেন। ময়দানে ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করেছেন।

    কাফিররা মক্কায় দুর্বল মুসলিমদের ওপর কী নির্যাতন করেছে, যুদ্ধে তারা কীভাবে লাঞ্ছিত হয়েছে, এখনও এসব কাজ না ছাড়লে পরিণাম কী হবে, এই নিয়ে কাফিরদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখা হয়েছে।

    এসকল বিষয় পরিষ্কার বর্ণনা করে দেওয়ার পর মুজাহিদদের মাঝে গনীমতের মাল বণ্টনের বিধান বর্ণনা শুরু হয়, যা পরের দিনের তারাবীহতে থাকবে।

  • আজকের তারাবীহ: ৫ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ৫ রমাদ্বান

    ০৫। সূরা মায়িদাহ, আয়াত ৮৩ থেকে ১২০

    আবিসিনিয়ার খ্রিষ্টান বাদশা নাজ্জাশি এবং তাঁর কতিপয় প্রতিনিধি কুরআন শুনে বুঝতে পারেন এটি আল্লাহর কালাম। তাঁদের চোখের পানি বেরিয়ে আসে। এঁদের প্রশংসা করে আয়াত নাযিল হয়।

    হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল বানাতে নিষেধ করা হয়। কসমের কাফফারা সংক্রান্ত বিধান বলা হয়। মদ, জুয়া, লটারি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে এগুলোর অপকারিতা বর্ণিত হয়।

    ইহরাম অবস্থায় শিকার করা, সামুদ্রিক খাবার ও স্থলের খাবার খাওয়ার বিধান বর্ণিত হয়েছে। অপবিত্র বস্তুর আধিক্য দেখেই সেগুলোকে পবিত্র না ভাবতে আদেশ করা হয়।

    আল্লাহর নাযিলকৃত সহজ বিধানগুলো নিয়ে খুঁটিনাটি প্রশ্ন করে জটিলতা বাড়াতে নিষেধ করা হয়। পূর্বের কিছু জাতি এরকম অতিরিক্ত প্রশ্ন করত, ফলে সেগুলোর জবাবে ওয়াহী নাযিল হয়ে বিধানগুলো এত কঠিন হয়ে যেত যে তারা নিজেরাই তা আর পালন করতে চাইত না।

    ওসিয়ত করা সংক্রান্ত কিছু বিধান বর্ণিত হয়।

    কিয়ামত দিবসে সকল নবী (আঃ) সাক্ষ্য দেবেন যে, তাঁরা কেউই নন বরং একমাত্র আল্লাহই গায়েবের জ্ঞান রাখেন।

    হাওয়ারীগণ (ঈসা আঃ এর সাহাবা) ঈসা (আঃ)-কে বলেছিলেন আল্লাহর কাছে দু’আ করে মু’জিযাস্বরূপ আসমান থেকে একটি মায়িদাহ (খাবারের দস্তরখানা) নাযিল করতে। এরকম মু’জিযার ফরমায়েশ করা সাধারণত কাফিরদের স্বভাব হলেও হাওয়ারীদের নিয়ত ছিলো ভিন্ন। তাঁরা এই আসমানী দস্তরখানা দেখে এবং তা থেকে খেয়ে ঈমানকে মজবুত করতে চেয়েছেন। আল্লাহ তা নাযিল করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং সাবধান করে দেন এরপর আর কুফরি করার সুযোগ নেই। অতঃপর কিয়ামাতের দিন ঈসা (আঃ)-কে সেসব মু’জিযার কথা স্মরণ করানো হবে, যা তিনি আল্লাহর নির্দেশে করতেন। তারপর জিজ্ঞেস করা হবে তিনি নিজেকে ও তাঁর মা-কে উপাস্য বানানোর কথা প্রচার করতেন কিনা। ঈসা (আঃ) তা অস্বীকার করবেন। ফলে তাঁকে ও মারইয়াম (আঃ)-কে উপাস্য মানা লোকেরা আযাবের উপযোগী হয়ে যাবে।

    ০৬। সূরা আন’আম

    সূরা আন’আমের শুরুতে সমগ্র সৃষ্টিজগতজুড়ে আল্লাহর ক্ষমতা ও জ্ঞানের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। কাফিরদের ঈমান আনতে বললে তারা সবসময় অলৌকিক জিনিস দেখতে চাইতো। কিন্তু এসব দেখলেও ঈমান আনতো না, বলত এগুলো স্রেফ জাদু (জাদু ও মু’জিযার পার্থক্য হলো, জাদুতে কেবল চোখের বিভ্রম ঘটে কোনো জিনিসকে অলৌকিক মনে হয়, আর মু’জিযার ফলে বাস্তবিকই কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটে)। মানুষ-নবীর বদলে ফেরেশতা আসলো না কেন এ নিয়ে তারা আপত্তি তুলত। অথচ ফেরেশতা আসলে তো এমন আকৃতি নিয়েই আসতো যা মানুষের দৃষ্টিসীমায় দেখা যায়। ফলে এটাকেও তারা অস্বীকার করার একটা না একটা অজুহাত খুঁজে নিত। আর এরকম নিদর্শন আসে শেষ সুযোগ হিসেবে। তখন কুফরি করলে একেবারেই সর্বনাশ। পূর্বে তুলনামূলক শক্তিশালী, প্রতিষ্ঠিত এবং অনুগ্রহপ্রাপ্ত বহু জাতী তাদের পাপের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে।

    আহলে কিতাবরা মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে কিতাবে বর্ণিত সেই নবী হিসেবে ঠিকই চিনতে পারছে, যেভাবে তারা চেনে নিজ সন্তানদের। তারপরও তারা অস্বীকার করছে।

    মুশরিকরা আল্লাহর কালাম শুনে এগুলোকে আদিকালের উপাখ্যান বলে ঠাট্টা করে। আখিরাতে তারা বিশ্বাস করে না। কিয়ামাতের দিন তারা দুনিয়ায় শির্ক করার কথা প্রথমে অস্বীকার করে বসবে। পরে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর পুনরায় পৃথিবীতে পাঠানোর আবেদন করবে যাতে এবার ভালো কাজ করে আসতে পারে। আল্লাহ জানিয়ে দেন যে আবার পৃথিবীতে পাঠালে সেই একই কাজই তারা করত।

    রাসূলকে (সাঃ) বলা হয় কাফিরদের কুফরের কারণে অতিরিক্ত মনঃপীড়া না পেতে। পূর্বেকার অনেক জাতিই নবীদের অবাধ্যতা করে ধ্বংস হয়েছে। তাদেরকে সংকট ও প্রাচুর্য উভয় অবস্থা দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। পরে আযাব দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। কখনো কখনো অবাধ্যদের দুনিয়াবি সুখ-ভোগের সুযোগ আল্লাহ বাড়িয়ে দেন যেন আরও কঠোরভাবে তাদেরকে পাকড়াও করা যায়।

    মক্কার মুশরিকরা বলত মুহাম্মাদ (সাঃ) নবী হলে তাঁর কাছে আল্লাহর ধনভাণ্ডার নেই কেন, ফিরিশতা তাঁর সাথে ঘোরে না কেন। তাদের ধারণা খণ্ডন করে বলা হয় নবী হওয়ার অর্থ এই না যে এসব প্রাচুর্য সাথে নিয়ে ঘোরাফেরা করতে হবে, গায়েব জানতে হবে। নবীর দায়িত্ব কেবল আল্লাহর বাণীসমূহ পৌঁছে দেওয়া।

    মক্কার বড় বড় নেতারা মুহাম্মাদ (সাঃ) এর আশেপাশে গরীব লোকদের দেখে হাসাহাসি করত। বলতো, আল্লাহ অনুগ্রহ করার জন্য তাদের মতো হোমরাচোমরাদের ফেলে এদেরকেই খুঁজে পেলেন! অথচ যারা ঈমান আনে, তারা গরীব হলেও ওইসব সম্ভ্রান্ত অহংকারীদের চেয়ে ভালো।

    যেই আযাবের ভয় দেখানো হয়, তা নিয়ে আসার জন্য কাফিররা চ্যালেঞ্জ করত। তাদের জানিয়ে দেওয়া হয় যে তা কখন, কীভাবে আসবে তা রাসূল (সাঃ) এর হাতে নয়, বরং আল্লাহরই এখতিয়ারে।

    বিপদে পড়লে কাফির মুশরিকরাও যে অন্য সব দেবদেবীদের ভুলে গিয়ে চুপিসারে আল্লাহর কাছেই সাহায্য চায়, তা উন্মোচন করা হয়েছে বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে। তারপরও বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পর তারা শির্ক করে।

    প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানুষের নিজেদের মধ্যকার যুদ্ধগুলো যেকোনো সময় আযাব হিসেবে চলে আসার ভয় দেখানো হয়।

    ধর্মকে খেলতামাশার বস্তু বানানো এসকল মুশরিক থেকে দূরে থাকতে বলা হয়। তবে দাওয়াহ দিতে হবে এই আশায় যে তারা সুপথ পাবে।

    শয়তান কীভাবে এদেরকে নিজ ‘হিদায়াত’ (পথ) এর দিকে ডেকে উদ্ভ্রান্ত করে দেয়, তা উপমা আকারে দেখানো হয়েছে। আল্লাহ প্রদত্ত হিদায়াতই আসল হিদায়াত।

    কিয়ামাত সংঘটিত হওয়া কেবল আল্লাহর একটি হুকুমের ব্যাপার। তিনি বলবেন ‘হও’, আর তা হয়ে যাবে।

    ইবরাহীম (আঃ) এর পিতা আযার ছিলো মূর্তিপূজক। বরং পুরো সম্প্রদায়ই এরকম ছিলো। ইবরাহীম (আঃ) এগুলোর অসারতা বুঝতে পারেন। নক্ষত্র, চাঁদ, সূর্য উপাস্য হতে পারে কিনা এ নিয়ে চিন্তাভাবনার পর তিনি এক আল্লাহর উপাসনায় মনস্থির করেন। তাঁর সম্প্রদায় তাঁর সাথে বাদানুবাদে লিপ্ত হয়। তিনি জানিয়ে দেন যে তারাই যখন মিথ্যা উপাস্যের মোকাবেলায় আল্লাহকে ভয় করছে না, তখন তাঁর কী কারণ থাকতে পারে যে তিনি আল্লাহর মোকাবেলায় এসব মিথ্যা উপাস্যদের ভয় করবেন। এরপর অন্যান্য কয়েকজন নবীর কথা বলা হয়। এঁরা সবাই বিশুদ্ধ তাওহীদের দিকে হিদায়াতপ্রাপ্ত ছিলেন। ইবরাহীমের বংশধর হিসেবে গর্ব করা আরব মুশরিকরা এখন চাইলে হিদায়াত গ্রহণ করুক, অন্যথায় ক্ষতিগ্রস্ত হোক। মুহাম্মাদ (সাঃ) তো তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করানোর মাধ্যমে কোনো দুনিয়াবি পারিশ্রমিক চাচ্ছেন না, অর্থাৎ তাঁর কোনো স্বার্থ এখানে নেই।

    রাসূলকে (সাঃ) অস্বীকার করতে গিয়ে কিছু আহলে কিতাব বলে বসে যে আল্লাহ কোনো কিতাব নাযিল করেন না। তাদের গোমর ফাঁস করে বলা হয় যে মূসা (আঃ) এর প্রতি নাযিলকৃত কিতাবে তারা বিশ্বাস করে, সেই সাথে এর অনেক অংশ নিজেদের সুবিধামতো বিকৃত করে ও লুকিয়ে রাখে।

    সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন জিনিসের উদাহরণ দিয়ে দেখানো হয় আল্লাহ কীভাবে প্রাণ সৃষ্টি করেন, মৃতকে পুনর্জীবিত করেন। চিন্তাশীলদের এগুলো নিয়ে চিন্তা করার জন্য বলা হয়।

    মুশরিকদের কেউ কেউ জিনদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করত, কেউ ফেরেশতাদের আল্লাহর কন্যা ভাবত, খ্রিষ্টানরা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র ভাবে। এসব ভুল ধারণা খণ্ডন করা হয়। আল্লাহ কোনোকিছুর জন্মদাতা নন, বরং স্রষ্টা। জন্মদানের মাধ্যমে বংশবিস্তারের প্রয়োজন তাদেরই থাকে যারা সত্ত্বাগতভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।

    আল্লাহ চাইলে সবাইকে জোরপূর্বক ঈমানদার বানিয়ে দিতেন। কিন্তু পরীক্ষার জন্য তাদের সকলকে স্বাধীন বোধবুদ্ধি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এরা ঈমান না আনলে অতিরিক্ত দুঃখ পেতে নিষেধ করা হয়। তাদের উপাস্যকে গালি দিতে নিষেধ করা হয়, নাহলে তারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দেবে।

    মুহাম্মাদ (সাঃ) নিজে কুরআনের মতো রচনাশৈলী রপ্ত করেছেন, এমন আজগুবি দাবি করতে কাফিররাও সাহস পেতো না। তাই তাদের কেউ বলতো যে অন্য কেউ তাঁকে এসব শিক্ষা দিয়েছে। অন্যত্র এ দাবি খণ্ডন করা হয়েছে।

    কাফিররা জোরালো কসম করে বলে মু’জিযা দেখলে তারা ঈমান আনবে। অথচ কুরআন শুনেই তারা ঈমান আনতে পারেনি, অন্য কোনো নিদর্শন দেখলেও এভাবেই মুখ ফিরিয়ে নেবে। পূর্বেকার নবীদের সাথেও কাফিররা এমন আচরণই করেছিল, অথচ তারাও মনে মনে বুঝত যে এগুলো আল্লাহর কালাম।

    অধিকাংশ মানুষ যে মত-পথ অনুসরণ করে, তা অন্ধভাবে অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়।

    মুসলিমরা জবাই করা ছাড়া অন্য মৃত পশু খেত না। কাফিররা ঠাট্টা করতে যে, আল্লাহ যাকে হত্যা করলেন তা তোমরা খাও না, আর নিজ হাতে হত্যা করা জিনিস খাও, এটা আবার কেমন ধর্ম? আল্লাহ এ ধারণা খণ্ডন করে দেন যে হালাল-হারাম নির্ধারণের এখতিয়ার আল্লাহর, তিনি যা ইচ্ছা হালাল-হারাম করবেন। আল্লাহর নাম না নিয়ে জবাই করা পশু খেতে নিষেধ করা হয়।

    কাফিররা দাবি করত তাদের ওপরও ওয়াহী নাযিল হলে পরে তারা ঈমান আনবে। তাদের এই মিথ্যা দাবিকে তিরস্কার করা হয়। জিন শয়তান ও মানুষ শয়তানেরা কীভাবে কিয়ামাতের দিন নিজের দোষ স্বীকার করতে বাধ্য হবে, তার চিত্র তুলে ধরা হয়। সত্যের ব্যাপারে অবহিত করা ছাড়া কাউকে শাস্তি দেয়া আল্লাহর রীতি নয়। তাই উভয় জাতির মাঝেই নবী-রাসূলগণ যথাযথভাবে দাওয়াতি কাজ করেছেন। অস্বীকারকারী জিন ও মানুষেরা কিয়ামাতের দিন নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে।

    মুশরিকরা কিছু মনগড়া হালাল-হারাম মেনে চলত। তারা আল্লাহর জন্য যেমন কুরবানী করত, তাদের অন্য উপাস্যদের জন্যও করত। তবে কখনোকখনো আল্লাহর জন্য নির্ধারিত পশু বা শস্যের সাথে অন্য পশু বা শস্যকে গুলিয়ে ফেললেও, অন্যান্য উপাস্যদের জন্য যা আলাদা করে রাখতো তাতে কখনোই হেরফের করত না। কিছু পশুর পিঠে চড়া হারাম মানতো, কিছু পশুর বাচ্চা হলে সেটা পুরুষরা খাবে, না নারীরা খাবে তা ঠিক করত, নিজেদের সন্তান হত্যা করাকে অভাব দূর করার ভালো উপায় ভাবত। এসব রসম-রেওয়াজ খণ্ডন করে প্রকৃত হালাল-হারামের কিছু বিধান বর্ণনা করা হয়। পূর্বের উম্মাতদের অবাধ্যতার জন্য তাদের ওপর কিছু অতিরিক্ত বস্তু হারাম করা হয়েছিল।

    সেসময়কার কাফিররাও এমন কথা বলত যে, আল্লাহ না চাইলে তো আমরা শির্ক করতাম না, আল্লাহ চাচ্ছেন বলেই আমরা শির্ক করি। এসকল কথা বলে তারা নিজেদের ভ্রান্তির ওপর অটল থাকত।

    অতঃপর এমন কিছু কাজের কথা বলা হয় যা মনগড়া রসম-রেওয়াজ নয়, প্রকৃতই সাওয়াবের কাজ। শির্ক না করা, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার, দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা না করা, গোপন ও প্রকাশ্য অশ্লীলতার কাছেও না যাওয়া, অন্যায় হত্যা না করা, ইয়াতীমের দেখভাল, মাপে কমবেশি করে লোক না ঠকানো, নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধে গেলেও ন্যায়বিচার করা।

    কুরআন নাযিল করে অজুহাতের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নাহয় মুশরিকরা বলতো ইহুদী-খ্রিষ্টানরা তাদের কিতাব আমাদের শিক্ষা দেয়নি তাই হিদায়াত পাইনি, অথবা আমাদের ওপর কিতাব নাযিল হলে আমরাই বেশি হিদায়াত পেতাম। অথচ কুরআন নাযিল করার পরও তারা অজুহাত দিচ্ছে। নতুন নতুন মু’জিযা দেখতে চাইছে। অথচ এসকল মু’জিযা তো শেষ সুযোগ হিসেবে আসে, যা অস্বীকার করলে সরাসরি আযাব পেতে হয়। প্রতিটি সৎকাজের প্রতিদান দশগুণ সওয়াব, প্রতিটি পাপের বিনিময় একটি করে গুনাহ। একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীম (আঃ) এর দ্বীনের অনুসারী হতে বলা হয়, যিনি মুশরিক ছিলেন না। জীবন, মৃত্যু, শারিরীক ইবাদত, আর্থিক ইবাদত সবই হতে হবে আল্লাহর জন্য, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।

  • আজকের তারাবীহ: ৪ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ৪ রমাদ্বান

    ০৪। সূরা নিসা, আয়াত ৮৭ থেকে ১৭৬

    মুনাফিকদের কেউ কেউ মদীনায় এসে ইসলাম গ্রহণের ভান করে আবার মক্কায় ফিরে গিয়ে কাফিরদেরকে ইসলামের বিরুদ্ধে সহায়তা করে। কেউ কেউ মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কোনো দুরভিসন্ধি পোষণ করে না। কেউ ভাব দেখায় যে যুদ্ধ করতে চায় না, কিন্তু কাফিরদের কাছ থেকে প্রস্তাব পেলে ঠিকই তাদের সাহায্য করে। এমন প্রত্যেক শ্রেণীর ব্যাপারে করণীয় বিধান বর্ণনা করা হয়।

    চুক্তিবদ্ধ জাতির কাছে আশ্রয় নেয়া এবং কোনো পক্ষের হয়েই যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করতে বলা হয়।

    ভুলবশত কোনো মুসলিমকে হত্যা করার কাফফারার বিধান বলা হয়। ইচ্ছাকৃত অন্যায়ভাবে মুসলিম হত্যার শাস্তির কথা বলা হয়।

    জিহাদের ময়দানে কোনো কাফির বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলে তাকে মুসলিম হিসেবে গণ্য করতে বলা হয়, তারা জান বাঁচাতে মিথ্যা বলছে এমন ধারণা না করতে বলা হয়।

    জিহাদ ফরজে কিফায়া থাকাকালীন কেউ কেউ বিনা ওজরে জিহাদে না গেলে দোষ নেই। তবুও ঘরে বসা লোকদের তুলনায় মুজাহিদদের মর্যাদা বেশি। হিজরত ফরজ হয়ে যাওয়ার পরও তা না করার ভয়াবহতা বর্ণিত হয়, তবে যাদের সামর্থ্য নেই তাদের কথা আলাদা। জিহাদের মাঠে সালাত আদায় করার নিয়ম বর্ণিত হয়।

    বিশর নামের এক মুনাফিক কিছু জিনিস চুরি করে এক নিরপরাধ ইহুদীকে ফাঁসায়। যদিও ওই ইহুদী বলে যে এসব জিনিস বিশর তাকে দিয়েছে, কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণ দিতে পারেনি। বিশরের গোত্রও তার পক্ষে ওকালতি করে। রাসূল (সাঃ) বিচার করার সময় আপাত প্রমাণের ভিত্তিতে ইহুদীকে দোষী সাব্যস্ত করেন। আল্লাহ আয়াত নাযিল করে বিশরের মুখোশ উন্মোচন করেন। নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফাঁসানো, অপরাধীর পক্ষে ওকালতি করা সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা ও এর ভয়াবহতা বর্ণিত হয়। এসব কাজ করে দুনিয়াতে পার পেয়ে গেলেও আখিরাতে শাস্তি হবে।

    সুন্নাহ এবং মুসলিমদের ইজমাও যে শরিয়তের দলীল, এ সংক্রান্ত কিছু ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

    শির্কের গুনাহ তাওবাহ ছাড়া মাফ হয় না। মুশরিকরা নারীদেরকে পুরুষদের চেয়ে নিকৃষ্ট ভাবে, অথচ ঠিকই নারীদেবীর উপাসনা করে। প্রকৃতপক্ষে তারা শয়তানের উপাসনা করে। শয়তান ওয়াদা করেছিলো যে সে তার অনুসারীদের অনেক আশা ভরসা দেবে এবং আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধনে প্ররোচিত করবে।

    নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সৎকর্মশীল ঈমানদারদের জন্য জান্নাতের লোভনীয় বর্ণনা দেওয়া হয়।

    ইয়াতীম নারীর দেখভাল, স্ত্রীদের মাঝে সমতাবিধানের স্বরূপ, স্বামী-স্ত্রীর মীমাংসা, বিরোধ ও বিচ্ছেদ সংক্রান্ত বিধি-বিধান বর্ণিত হয়।

    মুমিনদের বিরুদ্ধে মুনাফিকদের বিদ্বেষের কথা উন্মোচন করে তাদের সাথে ওঠাবসা-চলাফেরার বিধান বর্ণনা করা হয়। মুনাফিকদের স্থান জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে, তবে তাওবাহকারীদের কথা আলাদা।

    অন্যের দোষ চর্চা নিষেধ করা হয়, তবে জুলুমের বিচার করার জন্য এমন করা হলে ভিন্ন কথা। ক্ষমা করার মানসিকতাকে উৎসাহিত করা হয়।

    কিছু নবীর প্রতি ঈমান আনা আর অন্য কোনো নবীকে অস্বীকার করা পুরোটাই কুফরি।

    আহলে কিতাবরা মুহাম্মাদ (সাঃ) এর কাছে দাবি করে আসমান থেকে একটি কিতাব নামিয়ে এনে প্রমাণ দেখাতে। আল্লাহ এর জবাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, যেই মূসা (আঃ) এর ওপর তারা ঈমান আনার দাবি করে, তাঁর কাছে এরা এর চেয়ে গুরুতর দাবি করেছিলো। বলেছিলো আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখাতে। এর শাস্তিস্বরূপ তাদের ওপর বজ্র আঘাত হানে, তূর পাহাড়কে তাদের মাথার ওপর তুলে ধরা হয়। এছাড়া বাছুরপূজা, শনিবারের আইন লঙ্ঘন, অহংকার করা, নবীদের হত্যা করা, মারইয়াম (আঃ)-কে ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া ইত্যাদি কুকাজে তারা লিপ্ত ছিলো। ঈসা (আঃ) এর শূলবিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে তারা নিজেরাই নিশ্চিত না। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাঁকে জীবিত আসমানে তুলে নেন। কিয়ামাতের আগে ঈসা (আঃ) এর পুনরাগমন দেখে সব আহলে কিতাব এই বাস্তবতার ওপর ঈমান আনতে বাধ্য হবে। আর কিয়ামতের দিন ঈসা (আঃ) ঐসকল কুফরিকারীদের বিপক্ষে সাক্ষী হবেন। বনী ইসরাইলীদের এসব হঠকারিতার মূল্যস্বরূপ তাদের শরিয়তে অনেক বস্তু হারাম ছিল। তাদের মধ্যকার কাফির পাপাচারীদের শাস্তি ও মুমিন নেককারদের পুরষ্কারের কথা বলা হয়।

    মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সত্য নবী হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ ও ফেরেশতাগণ সাক্ষ্য দেন, যেমন সত্য ছিলেন পূর্বেকার সকল নবী যারা সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে আগমন করেছেন। খ্রিষ্টানদের ট্রিনিটির (ত্রিত্ববাদ) বিশ্বাসকে খণ্ডন করে তাওহীদের দাওয়াত দেওয়া হয়। ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র ভাবার একটা কারণ হলো আল্লাহর বান্দা হওয়াটাকে তারা ঈসা (আঃ) এর মর্যাদার পরিপন্থী ভাবতো। অথচ ঈসা (আঃ) নিজেকে আল্লাহর বান্দা ভাবতে মোটেও লজ্জা পেতেন না।

    পিতা, দাদা, পুত্র ও পৌত্র না থাকা অবস্থায় মারা যাওয়া ব্যক্তির সম্পদ বণ্টন সংক্রান্ত বিধান বর্ণিত হয়েছে।

    ০৫। সূরা মায়িদাহ, আয়াত ১ থেকে ৮২

    সূরা মায়িদাহ এর শুরুতে হালাল-হারাম খাদ্য, শিকার, হাজ্জের ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিকার, আহলে কিতাব নারীদের বিবাহ করা, ওজু, গোসল, তায়াম্মুমের নিয়ম বর্ণিত হয়। শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সকলের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার করতে বলা হয়।

    ইহুদী ও নাসারা উভয় সম্প্রদায় তাদের কিতাবের অনেক বিষয় গোপন করত যা আল্লাহ রাসূলের (সাঃ) মুখ দিয়ে প্রকাশ করিয়ে দেন। এই নিদর্শনের কথা বলে তাদেরকে এই নবীর প্রতি ঈমান আনতে বলা হয়। এসকল লোক নিজেদের আল্লাহর সন্তান দাবি করে, কিন্তু বিভিন্ন কারণে যে তারা আল্লাহর আযাবের শিকার হচ্ছে, তাও স্বীকার করে। আল্লাহ এই দ্বিমুখী বিশ্বাসের ত্রুটি তুলে ধরেন। ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর সন্তান বলে মনে করার জঘন্য বিশ্বাসকে খণ্ডন করা হয়।

    মূসা (আঃ) বনী ইসারইলকে নিয়ে প্রতিশ্রুত ভূমির (শাম ও ফিলিস্তিন) প্রান্তে এসে তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি নিতে বলেন। এতদিন এই ভূমির অপেক্ষায় থাকা বনী ইসরাইল এখন বলে ওঠে যে ওখানে অনেক শক্তিশালী জাতি থাকে, ওরা বের হয় গেলে পরে আমরা ঢুকব। মাত্র দুজন নেককার ব্যক্তি মূসা (আঃ) এর প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে অগ্রসর হতে রাজি হন। বনী ইসরাইলীরা মূসা (আঃ)-কে ধৃষ্টতা সহকারে বলে- আপনি আর আপনার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করেন, আমরা এখানে বসলাম। এর শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাদের ৪০ বছরের জন্য এ ভূমি থেকে দূরে রাখেন। ফলে জাতিটি এদিক সেদিক দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে থাকে। জিহাদের হুকুম আসার পরও গা বাঁচানো মানসিকতার ফলে এই শাস্তি হয়।

    মানবহত্যার ভয়াবহতা দেখানোর জন্য হাবিল ও কাবিলের ঘটনা বর্ণিত হয়। আত্মরক্ষা করা জায়েয হলেও হাবিল তাকওয়ার কারণে কাবিলকে কোনো বাধা দেননি। আল্লাহর হুকুমে একটি কাক এসে লাশ কবর দেওয়ার নিয়ম দেখিয়ে দেয়, কারণ এটি মানব ইতিহাসের প্রথম খুন, এমনকি প্রথম মৃত্যু। কাবিল আফসোস করে যে সে কাকটির মতোও বিচক্ষণ হতে পারল না। আল্লাহ হুকুম জারি করেন যে একটি নিরপরাধ প্রাণ হত্যা করা যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার শামিল। আর একটি নিরপরাধ প্রাণ বাঁচানো সমগ্র মানবজাতিকে বাঁচানোর শামিল। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাঃ) বিরুদ্ধাচরণ ও জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি (ডাকাতি এর অন্তর্ভুক্ত) করলে কী শাস্তি হবে, তা বিস্তারিত বলা হয়। কয়েক আয়াত পর চুরির শাস্তিও বর্ণিত হয়। তবে তওবা করে সুপথে চললে ক্ষমার সুসংবাদও দেয়া হয়।

    ইয়াহুদীরা তাওরাতের আইনগত শাস্তির বিধানগুলো পরিবর্তন করত। গরীবদেরকে শাস্তি দিত, ধনী কেউ অপরাধ করলে শাস্তি হালকা করে দিত। মুহাম্মাদ (সাঃ) এর কাছে বিচার চাইতে আসলে তাঁর শরিয়ত অনুযায়ী হালকা শাস্তি পাওয়া যাবে, এমন আশায় তাঁর কাছেও মামলা মোকদ্দমা নিয়ে আসত। কিন্তু যেসব বিধান এই শরিয়তেও একইরকম, সেসব ব্যাপারে রাসূল (সাঃ) একইরকম শাস্তির বিধানই দিতেন। ইয়াহুদীরা আগেই ঠিক করে আসত কোন কোন রায় দিলে তারা মানবে, আর কোন কোন রায় মানবে না। এ প্রসঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হয় যে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না তারা কাফির, জালিম, ফাসিক।

    ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের বন্ধু বানাতে নিষেধ করা হয়। ইসলামের বিরুদ্ধে তারাই একে অপরের বন্ধু। মুনাফিকরা তাদের শক্তিমত্তা দেখে তাদের সাথে যোগ দেয়। আল্লাহ ইসলামকে বিজয় দেওয়ার পর এরা বিপদে পড়ে যাবে।

    ঈমান আনার পর তা থেকে বিমুখ হলে আল্লাহ তাঁর প্রিয় ঈমানদার বান্দাদের অন্য কোনো দলের মাধ্যমে ইসলামের খেদমত করিয়ে নেবেন। মুমিনদের প্রতি কোমল হতে, কাফিরদের প্রতি কঠোর হতে, জিহাদ করতে এবং এ ব্যাপারে নিন্দুকদের পরোয়া না করতে হুকুম করা হয়।

    দ্বীন নিয়ে আহলে কিতাবদের ঠাট্টা মশকরা করাকে তিরস্কার করা হয়। তাদের অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ তাদের সাময়িক কষ্টে ফেলেন। এতে তারা বাধ্য না হয়ে উল্টো বলে বসে “আল্লাহ কৃপণ।” তাদের ওলামা মাশায়েখরাও তাদের এসব থেকে মানা করে না। অথচ আল্লাহর কিতাবের অনুসরণ করলে তাদের সবদিক থেকে রিযিক দেওয়া হত।

    রাসূলের (সাঃ) প্রতি যা নাযিল হয়েছে, তা প্রচার করতে বলা হয়। ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ মনে করা, ট্রিনিটিতে বিশ্বাস করা, মারইয়াম (আঃ)-কে অপবাদ দেওয়া ইত্যাদি কুফরি আকিদা খণ্ডন করা হয়। দ্বীনের ভেতর এসকল বাড়াবাড়িমূলক বিশ্বাস ও কাজকে তিরস্কার করা হয়।

    বনী ইসরাইলের মধ্যকার কাফিরদেরকে দাউদ (আঃ) ও ঈসা (আঃ) এর মুখ দিয়ে অভিশাপ দেওয়ানো হয়েছে।

    মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকার পরও ইয়াহুদীরা যে শত্রু মুশরিকদের সাথে গোপনে আঁতাত করে চলে, তা উন্মোচন করা হয়েছে। মুসলিমদের সাথ শত্রুতায় সবচেয়ে কঠোর হলো ইয়াহুদী ও মুশরিকরা। খ্রিষ্টানদের মাঝে জ্ঞানী, দুনিয়াবিমুখ ও নিরহংকারী লোক আছে। তাই অমুসলিম সম্প্রদায়সমূহের মাঝে তারাই মুসলিমদের প্রতি বন্ধুত্বে সবচেয়ে নিকটবর্তী।

  • আজকের তারাবীহ: ৩ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ৩ রমাদ্বান

    ০৩। সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৯২-২০০

    আল্লাহর রাস্তায় নিজের প্রিয়বস্তু খরচ করতে বলা হয়। তারপর আহলে কিতাবদের কয়েকটি আপত্তির জবাব দেওয়া হয়। পূর্বের নবীদের শরিয়তের কিছু হারাম জিনিস কেন মুহাম্মাদ (সাঃ) এর শরিয়তে হালাল করা হলো, তার হেকমত বর্ণিত হয়। এছাড়া আহলে কিতাবরা বলত মুসলিমরা কেন পূর্ববর্তী নবীদের কিবলা মাসজিদুল আকসার দিকে ফিরে নামাজ পড়ে না। জবাবে বলা হয় ইবরাহীম (আঃ) এর হাতে তৈরি মাসজিদুল হারাম তো আকসার আগে থেকেই ছিল আর প্রথম থেকেই এটা পবিত্র স্থান। ইবরাহীম (আঃ) কে সম্মান করা আহলে কিতাবরা ঠিকই এসব বিষয় জানে, জেনেশুনে শুধু শুধুই জিদের বশে এসব আপত্তি তোলে।

    মদীনার স্থানীয় দুই গোত্র আওস-খাযরাজ ছিলো পরস্পরের জানের দুশমন। ইসলাম গ্রহণের পর আল্লাহ তাদের মাঝে এমন সম্প্রীতি তৈরি করে দেন যে তারা ভালো কাজে প্রতিযোগিতা শুরু করে। ইহুদীরা তা দেখে অন্তর্জ্বালায় ভুগত। একবার তাদের একজন জাহিলি যুগের কথাগুলো বর্ণনা করে আগের সেই হিংসার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আল্লাহ আয়াত নাযিল করে আওস-খাযরাজকে দ্বীনি ভ্রার্তৃত্ব অটুট রাখার জন্য মর্মস্পর্শী নসিহত করেন। ইহুদীদের সম্পর্কে বলা হয় জাতিগতভাবেই তারা লাঞ্ছনার সিল মারা জাতি। বাইরের শক্তির সাহায্য ছাড়া তারা কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। তবে আহলে কিতাবদের সকলে একরকম নয়। যারা তাদের মাঝ থেকে ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদের প্রশংসা করা হয়।

    কাফিরদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়। তারা অন্তরে কী পরিমাণ বিদ্বেষ পোষণ করে, তা উন্মোচন করা হয়।

    তারপর উহুদ যুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে সুদীর্ঘ নসিহত করা হয়। উহুদের সংক্ষিপ্ত ঘটনা হলো মুশরিকদের আক্রমণ প্রতিহত করতে রাসূল (সাঃ) এক হাজার সৈন্যের ছোট দল নিয়ে অগ্রসর হন। মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ৩০০ জনকে নিয়ে মাঝপথ থেকে ফিরে আসে। যুদ্ধের ময়দানে রাসূল (সাঃ) এক জায়গায় ৫০ জন তীরন্দাজ নিযুক্ত করে সেখানেই স্থির থাকার কঠোর নির্দেশ দেন। প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিমরা আপাত জয়লাভ করে। কাফিরদের পালাতে দেখে তীরন্দাজদের বেশিরভাগই গনীমত সংগ্রহ করতে চলে আসেন। কাফিররা উল্টো দিক দিয়ে ঘুরে আবার আক্রমণ করলে মুসলিমরা বিপদে পড়ে যান। রাসূল (সাঃ) এর মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তারপরও আল্লাহর ইচ্ছায় মুসলিমরা আবার গুছিয়ে নিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ করে। কাফিররা কেন যেন যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি করা হয়েছে ভেবে ফিরে চলে যেতে থাকে। আল্লাহরই ইচ্ছা! তারপর আফসোস করে মাঝপথে ভাবে মুসলিমদের একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়ে আসা যেত। এই ভেবে আবার তারা আক্রমণে উদ্যত হয়। ওদিকে রাসূল (সাঃ) এর পুনর্নির্দেশে ক্লান্ত সাহাবাগণ শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবনে বীরবিক্রমে এগিয়ে আসেন। খবর পেয়ে মুশরিকরা অবশেষে সোজা বাড়ির পথ ধরে। বাহ্যিকভাবে মুসলিমরা উহুদে পরাজিত হয়। কিন্তু অনেক মুফাসসির একে বিজয় বলেছেন, কারণ উহুদ ছিলো শিক্ষার এক খনি।

    মুনাফিকদের মতো সংখ্যাধিক্যকে ভয় না পেয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। বদর যুদ্ধে কীভাবে আল্লাহ সাহায্য করেছেন তা স্মরণ করানো হয়।

    মুশরিকরা যুদ্ধে শক্তি বাড়াতে সুদে ঋণ নিয়েছিল। মুসলিমদের আল্লাহ এসব হারাম পথে পা বাড়াতে নিষেধ করেন। সৎকাজে প্রতিযোগিতা করা, সচ্ছল-অসচ্ছল উভয় অবস্থায় দানসদকা, রাগ গিলে ফেলা, ক্ষমা করা, গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত তাওবাহ করার অভ্যাস যাদের আছে, তাদের জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

    মুমিনরাই সবশেষে বিজয়ী হবে। ইতিহাসে সীমালঙ্ঘনকারী বিভিন্ন জাতির কী অবস্থা হয়েছে, তা জমিনে ঘোরাফেরা করে দেখতে বলা হয়। আর যুদ্ধে আল্লাহ জয়ও দিবেন, পরাজয়ও দিবেন। এটাই আল্লাহর পরীক্ষা, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। শহীদের মর্যাদা এমনি এমনি পাওয়া যায় না। কষ্ট করতে হয়।

    মুহাম্মাদ (সাঃ) একজন রাসূল মাত্র, তাঁর আগেও অনেক নবী-রাসূল গত হয়েছেন। তিনি মারা গেলে কি আমরা ইবাদাত করা ছেড়ে দেব? না, বরং মৃত্যু পর্যন্ত দ্বীনের ওপর অটল থাকতে হবে। আগের যুগেও আল্লাহওয়ালা লোকেরা নবীদের সাথে মিলে দৃঢ়পদে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাদের উভয় জাহানে কামিয়াবি দিয়েছেন।

    গনীমতের মাল পড়ে থাকতে দেখে দৌড়ে যাবার কিছু নেই। শেষপর্যন্ত তা তো শরিয়ত অনুযায়ী বণ্টিত হবে। কেউ কমবেশি করলে গুনাহগার হবে। যাইহোক, এ যুদ্ধে মুসলিমদের এসব ভুলত্রুটি আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন। রাসূল (সাঃ) তাঁর কোমল স্বভাবের কারণে কিছু বলেননি।

    মুনাফিকরা ভাবে যে তারা জিহাদে না গিয়ে বেঁচে গেছে। শহীদদের সম্পর্কে তারা বলে, “এরা আমাদের সাথে বসে থাকলে আজকে মারা যেত না।” আল্লাহ বলেন, মৃত্যু যদি এদের তাকদিরে থাকতই, তারা ঘর থেকে বের হয়ে নিজ গরজে মৃত্যুর জায়গায় চলে যেত। আর শহীদদেরকে মৃত ভাবা যাবে না। তাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতি রিযিক পান। আর সাথী ভাইয়েরাও শহীদ হয়ে তাঁদের সাথে যোগ দেবে, এই আশায় উন্মুখ হয়ে আছেন। জিহাদে গেলেই বরং আল্লাহ সম্মান সহকারে বিজয় দেন। সেখান থেকে জীবিত না ফিরলেও আল্লাহর ক্ষমা তো পাওয়া হয়েই যায়। মুনাফিকরা পারলে নিজেরা চির অমর হয়ে দেখাক!

    মুমিনদেরকে যদি বলা হয় তোমাদের বিরুদ্ধে বিশাল বাহিনী জমা হয়েছে, এতে তাদের ঈমান আরো বেড়ে যায়। আল্লাহ বিভিন্ন পরীক্ষায় ফেলে মুনাফিকদেরকে মুমিনদের মাঝ থেকে ছেঁকে বের করে নেন।

    আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে কৃপণতা করলে আখিরাতে সাজা ভোগ করতে হবে। আহলে কিতাবরা দান সদকার কথা শুনে ঠাট্টা করে বলত, “আল্লাহ গরীব, আমরা ধনী।” তাদের এই গুনাহের কথার ব্যাপারে আখিরাতের শাস্তির কথা বলা হয়। সম্পদ কুক্ষিগত করে স্বচ্ছন্দে থাকা লোকদের দেখে বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। আখিরাতে তাদের পরিণতি মন্দ।

    পূর্বের যুগে কুরবানির গোশত খাওয়া হালাল ছিল না। কুরবানি কবুল হলে আসমান থেকে আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিত। আহলে কিতাবরা মুসলিমদেরকে এরকম একটা নিদর্শন দেখানোর চ্যালেঞ্জ করে। আল্লাহ তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে আগেও তাদের সামনে এমন সুস্পষ্ট নিদর্শন ও কিতাব নিয়ে অনেক নবীই এসেছিলেন। তারা তো ঈমান আনেইনি, বরং তাঁদের হত্যা করেছে ও কিতাব বিকৃত করেছে। তবে তাদের মাঝে যারা ঈমান এনেছে ও আল্লাহর কিতাবকে দুনিয়াবি স্বার্থে স্বল্পমূল্যে বেচে দেয়নি, তাদের প্রশংসা করা হয়। আহলে কিতাব ও মুশরিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আরো অনেক তীর্যক কথাবার্তার সম্মুখীন হতে হবে এই মর্মে মুসলিমদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়।

    আল্লাহ এই সৃষ্টিজগত অনর্থক সৃষ্টি করেননি। এই সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তাফিকিরকারী লোকেরা আল্লাহর অস্তিত্ব অনুধাবন করে তাঁর কাছে সর্বক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ তাদের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের দু’আ কবুল করার প্রতিশ্রুতি দেন।

    ০৪। সূরা নিসা, আয়াত ১-৮৬

    সূরা নিসার শুরুতে আল্লাহকে ভয় করা, আত্মীয়ের হক আদায় করা, ইয়াতীমদের লালনপালন, বিবাহ, ইয়াতীমদের বিবাহ দেওয়া বা করা, দাসদাসীদের বিবাহ দেওয়া বা করা, সম্পদের উত্তরাধিকারে নারীপুরুষের অংশ ইত্যাদি সম্পর্কিত বিশদ আলোচনা করা হয়।

    ব্যভিচারের শাস্তি বিষয়ক কিছু প্রাথমিক বিধান বর্ণিত হয়। প্রকৃত তাওবাহকারীদের আল্লাহ ক্ষমা করেন। তবে যে গুনাহ করতেই থাকে আর মৃত্যু নিকটে আসলে তাওবাহ করে, তাদের কোনো ক্ষমা নেই। স্বামী স্ত্রীর মধ্যকার ন্যায়ানুগ সম্পর্ক, তালাক দিলে মোহর ফেরত না নেয়া সংক্রান্ত বিধান বর্ণিত হয়। কার কার সাথে বিবাহ সম্পর্ক করা হারাম, তার তালিকা বর্ণিত হয়।

    যুদ্ধবন্দিনী কাফির নারীদের সাথে সহবাসের বিধান বর্ণিত হয়। মুসলিম স্বাধীন নারীকে বিবাহের সামর্থ্য না থাকলে দাসীদের বিবাহ করতে বলা হয়। বিবাহকে নিছক আনন্দ সম্ভোগের পথ না বানিয়ে চরিত্রের হেফাজত এবং আল্লাহ মানুষকে বংশবিস্তার ও খিলাফাতের যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা পূর্ণ করার মাধ্যম বানাতে উৎসাহ দেওয়া হয়।

    জুলুম করে অন্যের সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করা হয়। কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে ছোটখাটো গুনাহগুলো মাফ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

    কিছু নারী সাহাবি ইচ্ছা পোষণ করতেন যে পুরুষ হলে তাঁরাও জিহাদের সাওয়াব পেতেন। আল্লাহ যাকে যে বিষয়ের এখতিয়ার দেননি, সে বিষয়ে এরকম কথাবার্তা বলতে নিষেধ করা হয়। প্রত্যেকের দায়িত্ব নিজ নিজ জায়গায় স্বতন্ত্র। নারীদের ওপর পুরুষদের অভিভাবকত্বের স্বরূপ ও পরিসর বর্ণিত হয়। স্বামী-স্ত্রীর কলহ মীমাংসার নিয়ম বর্ণিত হয়।

    শির্ক না করা, পিতামাতা, আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকট, দূর, অস্থায়ী প্রতিবেশী, পথচারী ও দাসদাসীদের প্রতি সদাচরণ করা ও অহংকার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

    কৃপণতা এবং লোকদেখানো দানের ভয়াবহতা বর্ণিত হয়।

    হাশরের ময়দানে প্রত্যেক উম্মতের মধ্য থেকে একজন করে সাক্ষী হাজির করা হবে এবং সেই সাক্ষীদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবেন মুহাম্মাদ (সা.)। সেদিন কাফিররা জমিনের সাথে মিশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করবে।

    মদ্যপান করে সালাতের নিকটবর্তী না হতে বলা হয়, যা মদ হারাম করা সংক্রান্ত প্রাথমিক পর্যায়ের একটি আয়াত। তায়াম্মুমের বিধান বর্ণিত হয়।

    আহলে কিতাবদের কিতাব বিকৃতি, দ্ব্যর্থবোধক কথা বলা ও শির্ক করার স্বভাবকে তিরস্কার করা হয়।

    আত্মপ্রশংসা এবং নিজেকে ক্রটিমুক্ত মনে করা বৈধ নয়। ইয়াহুদীরা নিজেদেরকে পবিত্র বলে বর্ণনা করত। আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাযিল করে এমন আচরণের নিন্দা করেছেন।

    আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও উলিল আমর (মুসলিমদের দায়িত্বশীল নেতা) এর আনুগত্য করতে বলা হয়। আমানতদার হওয়া এবং কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করার হুকুম করা হয়। ঈমান আনার দাবি করার পরও তাগুতের কাছে বিচার ফায়সালা চাওয়াকে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিচার ফায়সালার ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথাই মানতে হবে। পূর্বেকার উম্মতদের অনেক কঠিন বিধান মানতে হত (যেমন তাওবাহর অংশ হিসেবে পরস্পরকে হত্যা করা), অথচ আমাদের জন্য তা সহজ করা হয়েছে।

    অত্যাচারিত দুর্বল নারী, পুরুষ ও শিশুদের পক্ষ হয়ে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করা হয়। মুনাফিকরা এ ইবাদত থেকে দূরে থাকে। মুমিনদের বিপদে পড়তে দেখলে তারা খুশি হয় আর বিজয় পেতে দেখলে আফসোস করে।

    মাক্কী যুগে অত্যাচারিত হয়ে মুসলিমরা আশা করত যাতে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু তখন এ বিধান দিলে তা কেবল ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার প্রতিফলন হতো। আজ মাদানী যুগে জীবনে নিরাপত্তা আসার পর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের বিধান নাযিল হলে অনেকে আতংকিত হয়ে ভাবে “হায়! আর কিছু দিন পরে কেন নাযিল হলো না!”

    মৃত্যু তো একদিন আসবেই। তাই মৃত্যুভয়ে আল্লাহর বিধান পালনে পিছপা না হতে বলা হয়।

    কল্যাণ-অকল্যাণ আল্লাহর তরফ থেকেই আসে। তবে মানুষ নি’আমত পায় আল্লাহর অনুগ্রহে আর বিপদে পড়ে নিজ কৃতকর্মের দরুণ।

    গভীরভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যায় যে, সামান্যতম ত্রুটিমুক্ত কুরআন আল্লাহরই নাযিলকৃত কিতাব।

    যাচাই না করে গুজব ছড়ানোকে তিরস্কার করা হয়।

    সালামের জবাব দেওয়ার উত্তম নিয়ম আলোচিত হয়।

  • আজকের তারাবীহ: ২ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ২ রমাদ্বান

    ০২। সূরা বাকারাহ, আয়াত ২০২ থেকে ২৮৬

    হাজ্জের বিধিবিধান বর্ণনা শেষে মুনাফিক ও সাচ্চা ঈমানদারের পার্থক্য বর্ণনা করে ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ করার হুকুম করা হয়েছে। কাফিররা বলত স্বয়ং আল্লাহ নিজেকে দেখা দিয়ে হুকুম করলে তারা মানবে। অথচ আল্লাহর নিদর্শনসমূহ দেখেও ঈমান না আনা এইসকল লোকেরা যে হঠকারি মানসিকতার কারণেই এই অজুহাত দেয়, তা উন্মোচন করা হয়েছে।

    কাফিররা নিজেদের ধনসম্পদের প্রাচুর্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলত আল্লাহ তাদের প্রতি খুশিই আছেন। আখিরাতে তাদের অবস্থা কেমন হবে আর ঈমানদারদের মর্যাদা কত বেশি হবে, তা স্মরণ করিয়ে আল্লাহ তাদের ভুল ধারণা খণ্ডন করেন।

    আদম (আঃ) থেকে শুরু করে মানবজাতি একই উম্মত ছিল, পরে তারা বিভিন্ন মনগড়া ধর্মমতে ভাগ হয়ে পড়ে। আল্লাহ যুগে যুগে কিতাব আকারে তাঁর হিদায়াত পাঠান। যারা নিজেরাই এই কিতাব বিকৃত করে ফেলেছে, তাদের দুর্ভোগের কথা বলা হয়। ঈমানদারদেরকে আল্লাহ এসব থেকে বাঁচিয়ে সঠিক পথের দিশা দেন।

    পূর্ববর্তী নবী ও উম্মতগণ কত কষ্টের মাঝে দিয়ে অতিক্রম করেছেন, তা জানিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া হয়। অতঃপর যুদ্ধ ফরজ করার হেকমত বর্ণিত হয়।

    কুরাইশদের কাফেলা আক্রমণের ঘটনায় সাহাবিদের হাতে একজন মারা যায়, কিন্তু তা ঘটে পবিত্র মাসসমূহের শেষ দিনে, যেসব মাসে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিলো। কাফিররা এটা নিয়ে তোলপাড় করে ফেলে যে মুসলিমরা নিজেরাই পবিত্র মাসসমূহের সম্মান করে না। আল্লাহ এ ব্যাপারে আয়াত নাযিল করে কাফিরদের আরো বড় বড় সব গুনাহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দেখান যে এই একটা বিষয়ে তাদের এত মায়াকান্না শোভা পায় না। এর বিপরীরতে ঈমানাদার মুহাজির মুজাহিদদের আল্লাহর রহমতের সুসংবাদ দেওয়া হয়।

    মদ-জুয়া নিষিদ্ধ করার প্রাথমিক স্তরের আয়াত নাযিল হয়, যেখানে বলা হয় এসব জিনিসে সামান্য উপকার থাকলেও ক্ষতি অনেক বেশি।

    ইয়াতীমদের লালনপালনের ব্যাপারে মধ্যমপন্থার সবক দেওয়া হয়। খুব কড়াকড়ি করতে গিয়ে নিজ পরিবারকে অভুক্ত রাখাও যাবে না, আবার ইয়াতীমদের একেবারে অবহেলাও করা যাবে না।

    মুশরিকদের সাথে বিবাহসম্পর্ক স্থাপন নিষেধ করা হয়। ঈমানদার দাসদাসীও মুশরিক সম্ভ্রান্তদের চেয়ে উত্তম।

    ঋতুস্রাব চলাকালীন সহবাস না করা, যেসব পথে সহবাস জায়েয সেসব রাস্তায় পছন্দমতো সহবাস করার হুকুম বর্ণিত হয়।

    আরবদের মাঝে কথায় কথায় কসম করার প্রবণতা আছে। অনর্থক কসমের ব্যাপারে বিধান বর্ণিত হয়েছে। তারপর তালাক, ইদ্দত, মোহর, শিশুকে দুগ্ধদান, বিধবা বিবাহ, বিবাহের ইচ্ছাপোষণ করা, বিবাহের প্রস্তাব পাঠানো, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তাদের খোরপোষের ব্যাপারে ন্যায়সঙ্গত পন্থা কী হবে তা বর্ণনা করা হয়েছে। সালাতের গুরুত্বের কথা দিয়ে এ বিধবিধান বর্ণনা শুরু হয়েছিল, শেষে এসে এর কথা আবার বলা হয়, বিশেষ করে আসরের সালাত। যুদ্ধাবস্থায়ও সালাতের গুরুত্ব ও বিধান বলা হয়।

    আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে জীবন ও সম্পদ কোরবানি করার উৎসাহ দিয়ে কয়েকটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়, যেখানে দেখানো হয় হায়াত-মাওত আল্লাহর হাতে। আর সবসময় উম্মাহর মাঝে এমন লোক ছিলো, যারা বিভিন্ন অজুহাতে জিহাদ থেকে দূরে থাকে।

    প্রাচীনকালের কোনো এক সম্প্রদায় জীবন বাঁচানোর লক্ষ্যে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যায়। আল্লাহ তাদের মৃত্যু দিয়ে আবার জীবিত করে দেখিয়ে দেন মৃত্যু তাকদিরে থাকলে তা আসবেই। নবী উযাইর (আঃ)-কে আল্লাহ একবার মৃত্যু দিয়ে একশ বছর পর পুনর্জীবিত করেন। নবীদের ঈমানকে মজবুত করতে আল্লাহ এরকম চাক্ষুষ নিদর্শন দেখাতেন তাঁদের। এছাড়া ইবরাহীম (আঃ)-কে চারটি পাখি জবাই করে কেটে তাদের গোশত মিশিয়ে চারটি পাহাড়ের চূড়ায় রেখে ডাক দিতে বলা হয়। এতে পাখিগুলো অবিকৃত অবস্থায় জীবিত হয়ে তাঁর দিকে ছুটে আসে। এছাড়া নমরুদ একজন কয়েদীকে হত্যা করে, আরেকজনকে ছেড়ে দিয়ে বোকার মতো নিজেদে জীবন-মৃত্যুর মালিক দাবি করে। ইবরাহীম (আঃ) তাকে সূর্য পশ্চিম দিকে থেকে উদিত করে দেখাতে বললে তার অপারগতা প্রকাশ পেয়ে যায়। এছাড়া বনী ইসরাইলের একটি ঘটনা বর্ণিত হয়। সামুয়েল (আঃ) এর নবুওয়ত কালে বনী ইসরাইল তাঁর কাছে গিয়ে নিজেদের জন্য একজন বাদশাহ নিযুক্ত করে দিতে বলে যাতে তাঁর অধীনে জিহাদ করতে পারে। সামুয়েল (আঃ) বলেন তারা যে চরম মুহূর্তে গিয়ে পিঠটান দেবে না, তারা নিশ্চয়তা কী। বনী ইসরাইল আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে থাকে ভিটেমাটি থেকে উতখাত হয়েও কেন তারা জান লাগিয়ে জিহাদ করবে না! তারপর আল্লাহর নির্দেশে তালূত (আঃ) বাদশাহ নিযুক্ত হন। তিনি বনী ইসরাইলের যোদ্ধাদের কিছু কঠিন পরীক্ষার মাঝ দিয়ে নেন। বেশিরভাগই এতে ঝরে পড়ে। বাকিরা আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে যে, আল্লাহর সাহায্যে কত ছোট দলই তো কত বড় দলকে হারিয়েছে। তালূত (আঃ) এর বাহিনী জালূতের বিশাল সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করে। তালূত (আঃ) এর বাহিনীতে দাউদ (আঃ) ছিলেন, যিনি তখনও নবী হননি। তিনি মহাশক্তিধর জালূতকে হত্যা করে বনী ইসরাইলের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কোনো কোনো নবী (আঃ)-কে আল্লাহ অন্য নবীদের চাইতেও উঁচু মর্যাদা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, মুমিনরা সমস্ত নবী (আঃ)-এর ওপরই সমানভাবে ঈমান আনে। তবে শরী‘আত কেবল মুহাম্মাদ (সাঃ) এর প্রতিষ্ঠিত দ্বীন অনুযায়ীই হবে। এসব ঘটনা এবং বিধানের ফাঁকেই আল্লাহর মহাক্ষমতার বর্ণনা সম্বলিত আয়াতুল কুরসি রয়েছে। এবার যার ইচ্ছা হয় আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাঁর রাস্তায় কাজ করবে, কোনো জবরদস্তি নেই। আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক আর তাগুত কাফিরদের অভিভাবক।

    আল্লাহর পথে দানসদকা করলে সাতশ গুণ বা তারও বেশি সাওয়াব হয়। দান করে খোঁটা দেওয়ার স্বভাবকে তিরস্কার করা হয়েছে। উত্তম কথা বলার আদেশ করা হয়েছে। বিভিন্ন উপমা দিয়ে দেখানো হয়েছে এসব খোঁটার কারণে কীভাবে দানের সাওয়াব নষ্ট হয়ে যায়। লোক দেখানোর নিয়ত না থাকলে প্রকাশ্যেও দান করা যায়, তবে গোপনে করা আরো উত্তম। গরীবদের পাশাপাশি সেসব মিসকীনকেও খুঁজে খুঁজে দান করতে বলা হয় যারা আত্মসম্মানের জন্য হাত পাততে পারে না।

    সুদের লেনদেন নিষিদ্ধ করে ব্যবসা ও দানসদকাকে প্রশংসা করা হয়েছে। পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা মাফ। এখন থেকে আর কেউ সুদ লেনদেন করবে না। পাওনা টাকার সুদ মাফ করে শুধু আসল ফেরত নেবে। যারা অন্যথা করবে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাঃ) বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নিক। অস্বচ্ছল দেনাদারদের অবকাশ দেওয়া বা ক্ষমা করার আদেশ করা হয়।

    লেনদেনের ক্ষেত্রে সাক্ষীসহ লিখিত ডকুমেন্ট রাখার গুরুত্ব ও নিয়ম নিয়ে বলা হয়। লেখার সুযোগ না থাকলে জিনিস বন্ধক রাখার নিয়মাদি বর্ণনা করা হয়।

    আল্লাহ মানুষের অন্তরের গোপন বিষয়ের ব্যাপারেও হিসাব নেবেন। আল্লাহ কারো ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপান না। ঈমানদারদের দায়িত্ব হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশসমূহের প্রতি “শুনলাম ও মানলাম” মানসিকতা রাখা। আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও রাসূলগণের ওপর ঈমান আনতে হবে। আল্লাহ যেন আমাদের ওপর সাধ্যাতীত দায়িত্ব না দেন, আমাদের ভুলত্রুটি মাফ করেন ও কাফিরদের বিরুদ্ধে সাহায্য করেন, সেই দু’আ শেখানোর মাধ্যমে শেষ হয় কুরআনের দীর্ঘতম এই সূরা।

    ০৩। সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১ থেকে ৯১

    সূরা আলে ইমরানের শুরুতে বলা হয়েছে আল্লাহ ফুরকান নাযিল করেছেন, যার অর্থ সত্যমিথ্যার প্রভেদকারী। হতে পারে এটি কুরআন, অথবা আল্লাহর নাযিলকৃত অন্য কোনো জ্ঞান। কুরআনের কিছু আয়াত স্পষ্ট আদেশনির্দেশাদি সম্বলিত বা মুহকামাত। এগুলোই কিতাবের মূল অংশ যা আমাদের পালন করতে হবে। আর কিছু আয়াত আমাদের পূর্ণ জ্ঞানে আয়ত্ত করা সম্ভব না, এদের বলে মুতাশাবিহাত। যেমন আলিফ-লাম-মীম এর অর্থ, আল্লাহর আরশে আরোহণের স্বরূপ ইত্যাদি। যাদের মনে বক্রতা আছে তারা এগুলো নিয়ে অপ্রয়োজনীয় দার্শনিক আলাপে লিপ্ত হয়ে পথভ্রষ্ট হয়। আমাদের দায়িত্ব কেবল এগুলোর প্রতি ঈমান আনা।

    কুফর অবলম্বনকারীরা শক্তিশালী হলেও ফিরআউনের মতো পরাজিত হবে। বদরের প্রান্তরে কাফিররা এভাবেই শক্তিশালী হওয়ার পরও পরাজিত হয়। ঈমানদাররা দুনিয়ার মোহাবিষ্টকারী জিনিসের চেয়ে আখিরাতের স্থায়ী সম্পদকে বেশি ভালোবাসে। তারা ধৈর্যশীল, ইবাদতগুজার, আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়কারী ও ফজরের ওয়াক্তের আগ মুহূর্তে সাহরির সময়ে ইস্তিগফারকারী।

    বনী ইসরাইলীরা ভাবে তারা জাহান্নামে গেলেও অল্প সময়ের জন্য যাবে, কারণ তারা আল্লাহর প্রিয়পাত্র। আল্লাহ তাদের কিতাব বিকৃত করা ও নবীদেরকে হত্যা করার কথা স্মরণ করিয়ে আযাবের ‘সুসংবাদ’ দেন। মুসলিমরা রোম ও পারস্য বিজয় করবে এমন কথা শুনে তারা হাসত। অথচ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দেন, যাকে ইচ্ছা লাঞ্চিত করেন।

    মুমিনগণ যেন মুমিনদের নিজেদের ছেড়ে কাফিরদেরকে বন্ধু না বানায়। অবশ্য দুর্বল অবস্থায় আত্মরক্ষার প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা।

    আল্লাহকে ভালোবাসলে রাসূলের অনুসরণ করতে হবে।

    ইমরানের স্ত্রী তাঁর গর্ভের সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করার নিয়ত করেন। কিন্তু কন্যাসন্তান হওয়ায় একটু হতাশ হন। এই কন্যা ছিলেন মারইয়াম (আঃ)। তাঁর দ্বারা দ্বীনের যে খেদমত হয়, তা কোনো ছেলের দ্বারা হওয়া সম্ভব ছিল না। তিনি বায়তুল আকসার খাদিমা থাকাকালে আসমান থেকে তাঁর কাছে রিযিক আসত। কুমারী অবস্থায় তাঁর গর্ভে ঈসা (আঃ) আসেন, যিনি আল্লাহর ইচ্ছায় শিশুবয়সে কথা বলার মাধ্যমে তাঁর মা-কে ব্যভিচারের অপবাদ থেকে রক্ষা করেন।

    ইমরানের মৃত্যুর পর লটারি করে মারইয়ামের অভিভাবক ঠিক করা হয় যাকারিয়া (আঃ)-কে। তিনি মারইয়াম (আঃ) এর কাছে আসমানী রিযিক আসতে দেখে বৃদ্ধ বয়সেও সন্তানলাভের জন্য আশান্বিত হন। আল্লাহর কাছে দু’আ করলে তাঁকে ইয়াহইয়া (আঃ) নামক সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়। নবুওয়াতি জীবনে ইয়াহইয়া (আঃ) ছিলেন ঈসা (আঃ) এর সহায়তাকারী।

    ঈসা (আঃ) আল্লাহর হুকুমে মাটির পাখিতে প্রাণ ফুঁকে দেওয়া, মৃতকে জীবিত করা, জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য করার মু’জিযা দেখাতেন। তিনি তাওরাতকে সত্য বলে সাক্ষ্য দেন। তবে মূসার (আঃ) শরিয়তের কিছু হারাম বস্তু ঈসার (আঃ) শরিয়তে হালাল হয়। হাওয়ারীগণ (ঈসা আঃ এর সাহাবা) আল্লাহর রাস্তায় সাহায্যকারী হওয়ার ওয়াদা করেন। কাফিররা চক্রান্ত করলে আল্লাহ তাঁকে তুলে নেন। ঈসা (আঃ) এর ওপর ঈমান আনয়নকারীদেরকে কুফরিকারীদের ওপর প্রবল করার প্রতিশ্রুতি দেন। ইতিহাসেও দেখা যায় বেশিরভাগ সময়ে মুসলিম ও খ্রিষ্টানরা অন্যান্য জাতির ওপর প্রবল ছিল। ঈসা (আঃ) আল্লাহর অলৌকিক সৃষ্টি, যেমন আদম (আঃ) ছিলেন পিতামাতাবিহীন সৃষ্টি। আল্লাহর কাছ থেকে এ সত্য আসার পরও যারা বিতণ্ডা করে, তাদের সাথে প্রয়োজনে মুবাহালা করতে বলা হয়। মুবাহালা হলো বিতণ্ডায় কোনো পক্ষ সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখার পরও হঠকারিতা করলে উভয়পক্ষ সপরিবারে উপস্থিত হয়ে বাতিল পক্ষের ওপর আল্লাহর আযাব কামনা করা।

    ইবরাহীম (আঃ)-কে ইয়াহুদীরা ইয়াহুদী মনে করে, খ্রিষ্টানরা খ্রিষ্টান মনে করে। অথচ এ দুটো নাম এসেছে তাওরাত ও ইঞ্জিল নাযিলের পর, আর ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন এর আগের। ইবরাহীমের সবচেয়ে নৈকট্যের দাবিদার মুহাম্মাদ (সাঃ) এর ওপর ঈমান আনা মুসলিমরা। আহলে কিতাবরা তা জেনেও গোপন করছে।

    আহলে কিতাবদের কেউ কেউ ষড়যন্ত্র করে যে একদিন তারা ঈমান আনার ভান করে পরে অস্বীকার করে বলবে “আমরা মুহাম্মাদকে (সাঃ) কাছ থেকে দেখেছি। এই লোক কিতাবে বর্ণিত সেই নবী নয়।” এতে লোকজনকে বিভ্রান্ত করা সহজ হবে। আল্লাহ তাদের পরিকল্পনা ফাঁস করে দেন। তাদের অনেকে ভালো আমানতদার, আবার অনেকে খিয়ানতকারী। কারণ তারা ভাবে আহলে কিতাবদের বাইরে কারো আমানতের খিয়ানত করা পাপ নয়। তাদের অনেকে কিতাব তিলাওয়াতের সময় জিহ্বা বক্র করে এর কথা পরিবর্তন করে ফেলত। এভাবেই ইয়াহুদীরা উযাইর (আঃ)-কে এবং খ্রিষ্টানরা ঈসা (আঃ) কে আল্লাহর পুত্র বানিয়ে ছাড়ে। অথচ জ্ঞানবান মাত্রই বুঝতে পারে তাওহীদের দাওয়াত প্রদান করা এই নবীগণ নিজেদেরকে আল্লাহর স্থানে বসাতে পারেন না। আল্লাহ সমস্ত নবীর কাছ থেকে এই ব্যাপারে ওয়াদা নিয়েছেন যে, তাঁদের কারো জীবদ্দশায় অন্য কোনো নবী এলে তিনি নতুন নবীর সত্যায়নকারী এবং সাহায্যকারী হবেন।

    ইসলাম ছাড়া অন্য দ্বীনের অনুসারীরা আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। ঈমান আনার পর কেউ কুফরী করলে তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ এবং সমস্ত মানুষের লানত। সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে।

  • আজকের তারাবীহ: ১ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ১ রমাদ্বান

    ১। সূরা ফাতিহা, আয়াত ১-৭

    সূরা ফাতিহায় বান্দা আল্লাহর প্রশংসা ও গুণাগুণ বর্ণনা করে। সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহর প্রাপ্য। তিনি মানুষের জানা-অজানা সকল কিছুরই প্রতিপালক। তিনি সাধারণভাবে সকলের প্রতি দয়াবান (রহমান), তাঁর দেওয়া সূর্যের আলো, নদীর পানি সকলেই পায়। কিন্তু বিশেষভাবে শুধু মুমিনদের প্রতি দয়ালু (রহীম), জান্নাত শুধু মুমিনরাই পাবে। তিনি বিচার দিবসের মালিক। তারপর একমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত করা ও তাঁর নিকট সাহায্য চাওয়ার কথা স্বীকার করা হয়। এই শিষ্টাচারের পর আল্লাহর কাছে সরল পথ চাওয়া হয়। এই পথে আল্লাহর নিয়ামাতপ্রাপ্ত বান্দারা চলেছেন। এঁরা হলেন নবীগণ, সিদ্দীক্বগণ, শহীদগণ ও সলিহগণ। এবং তাদের পথ থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাওয়া হয়, যাদের ওপর আল্লাহর গযব (ইয়াহুদী) এবং যারা পথভ্রষ্ট (খ্রিষ্টান)।

    ০২। সূরা বাকারা, আয়াত ১-২০১

    কুরআনকে মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াহ বলার পর মুত্তাকীদের কতিপয় বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। তারপর কাফির ও মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। তারপর কাফির মুনাফিকদের অবস্থা কয়েকটি উপমার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের ওপর আল্লাহর বিভিন্ন অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে তাঁর দাসত্ব করতে বলা হয়। কুরআন আল্লাহর বাণী হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ করলে অনুরূপ সূরা তৈরি করার চ্যালেঞ্জ করা হয়। কাফিরদের জন্য জাহান্নামের শাস্তি ও ঈমানদারদের জন্য জান্নাতের নিয়ামতের কিছু বর্ণনা দেওয়া হয়। কুরআনে আল্লাহ তুচ্ছাতিতুচ্ছ বস্তুর উপমা কেন ব্যবহার করেন, এ ব্যাপারে কাফিরদের আপত্তির জবাব দেওয়া হয়েছে। উল্টো তাদের ভণ্ডামিগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

    আল্লাহ কর্তৃক আদম (আঃ) এর সৃষ্টির ইচ্ছা করা থেকে শুরু করে আদম-হাওয়া (আঃ) এর জমিনে অবতরণ ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা পাওয়া পর্যন্ত ঘটনা বর্ণিত হয়। ওয়াহী আকারে আসা এসব হিদায়াতের অনুসরণ যারা করবে, তারা জান্নাতি। অন্যথায় জাহান্নামি।

    বনী ইসরাইল, ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের উদ্দেশ্য করে ঈমান আনার জন্য দীর্ঘ নসিহত করা হয়। সত্যের সাথে মিথ্যা মিশ্রণ ও সত্য গোপন করতে নিষেধ করা হয়। বনী ইসরাইলের ওপর আল্লাহর বিভিন্ন নিয়ামতের কথা স্মরণ করানো হয়। তাদেরকে মানবজাতির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান, ফিরাউন ও তার দলকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে তাদের মুক্ত করা, মূসার (আঃ) অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাছুরপূজা করার পরও তাদের ক্ষমা করা, আসমান থেকে মান্ ও সালওয়া পাঠানো, পাথর থেকে তাদের বারটি গোত্রের জন্য বারটি ঝর্ণা প্রদানের কথা স্মরণ করানো হয়। এরপরও তারা নানাভাবে মূসা (আঃ) কে কষ্ট দেওয়া ও অন্য অনেক নবীকে হত্যা করার মতো জঘন্য কাজ করে আযাবে পতিত হয়। আগের উম্মতদের মাঝে যারা তাওহীদের ওপর মৃত্যুবরণ করেছে, তারা আখিরাতে পুরষ্কার পাবে। এছাড়া বনী ইসরাইলের সীমালঙ্ঘনকারীদের বিভিন্ন আযাব দেওয়া হয়েছিল, তা স্মরণ করানো হয়। তাদের মাথার ওপর তূর পর্বতকে এনে তুলে ধরা, শনিবারের আইন অমান্যকারীদের বানরে পরিণত করা ইত্যাদি। তাদের মাঝে এক ব্যক্তির হত্যাকারীকে আল্লাহ অলৌকিকভাবে সনাক্ত করে দেন। তা হলো একটি গাভী জবাই করে তার গোশত মৃতের গায়ে মারা, এতে সে জীবিত হয়ে অপরাধীর নাম বলে দেয়। এই গাভী জবাইয়ে অনীহার কারণে বনী ইসরাইল বারবার মূসা (আঃ) এর কাছে এর বয়স, রং ইত্যাদি নিয়ে অনেক খুঁটিনাটি প্রশ্ন করে কালক্ষেপণ করেছিল। এত এত নিদর্শন দেখানোর পরও তাদের অনেকের অন্তর পাথরের চেয়ে শক্ত রয়ে যায়।

    বনী ইসরাইলের স্বভাব স্মরণ করিয়ে দিয়ে ঈমানদারদের সতর্ক করা হয়েছে। এরা আসমানী কিতাবে রাসূলের (সাঃ) আগমন সম্পর্কে পড়েছে, কিন্তু জিদের বশে সে কথা গোপন করছে এবং কিতাব বিকৃত করেছে। আখিরাতে জান্নাতে যাওয়ার ব্যাপারে তারা খুব আত্মবিশ্বাসী। আল্লাহ তাদের দ্বীন অমান্য করার ফিরিস্তি স্মরণ করিয়ে দিয়ে জান্নাত পাওয়ার সঠিক ক্রাইটেরিয়া জানিয়ে দেন। তাদের বংশ থেকে শেষ নবী আসেনি বলে তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, অথচ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা নবুওয়ত দেওয়ার অধিকার রাখেন। তাদের আরো ভণ্ডামি উন্মোচন করে বলা হয় তারা যদি আসমানী কিতাবে বিশ্বাসী হয়েই থাকে তাহলে পূর্বের নবীদের হত্যা করলো কেন। এরা জান্নাতে যাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হলে মৃত্যু কামনা করে না কেন? বরং দুনিয়ার জীবনকে এরাই বেশি ভালোবাসে।

    সুলাইমান (আঃ)-এর বিরুদ্ধে তারা জাদুবিদ্যা চর্চার অভিযোগ করত (জাদুবিদ্যা কুফরি)। আল্লাহ তাদের এ ধারণা খণ্ডন করে জাদুটোনার আসল ইতিহাস বলেন। ব্যাবিলনে হারুত-মারুত দুই ফেরেশতাকে দিয়ে আল্লাহ জাদুর শিক্ষা দুনিয়াতে পাঠান পরীক্ষাস্বরূপ। ফেরেশতাদ্বয় খোলাখুলি বলে দিতেন যে জাদু শেখা কুফর, তারপরও ক্ষমতার লোভে পড়ে মানুষ তা শিখত এবং নানা অনাচার ঘটাত।

    ইহুদীরা দ্ব্যর্থবোধক কথা বলে রাসূলকে (সাঃ) গালি দিত। আল্লাহ ঈমানদারদের এসব দ্ব্যর্থবোধক কথা বাদ দিয়ে স্পষ্ট বাচনভঙ্গি শেখান।

    কোনো আয়াত বা আয়াতের হুকুম রহিত করে নতুন হুকুম বা আয়াত কেন আনা হয়, তার হেকমত বর্ণনা করা হয়েছে।

    ইহুদী-খ্রিষ্টানরা আল্লাহর সন্তান আছে বলে যে আকিদা পোষণ করে তা খণ্ডন করা হয়েছে। ঈমানদাররা এদের মিল্লাত অনুসরণ না করা পর্যন্ত তারা যে ঈমানদারদের প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, এ ব্যাপারে সাবধান করা হয়। বনী ইসরাইলের মাঝে যারা শেষ নবীর ওপর ঈমান এনেছে তাদের প্রশংসা করা হয়েছে।

    মুসলিম, ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের সকলের সম্মানিত ব্যক্তি ইবরাহীম (আঃ) এর কথা স্মরণ করানো হয়েছে। তাঁর বংশধরদেরকে আল্লাহ মানবজাতির নেতা বানানোর ওয়াদা করেন, কিন্তু জালিমরা এ ওয়াদার বাইরে। ইবরাহীম ও ইসমাইল (আঃ) এর কাবা নির্মাণের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি তাঁর বংশধরদের এই দ্বীন পালন করার ওসিয়ত করে যান এবং তিনি ছিলেন দ্বীন ইসলামের অনুসারী। তাঁর বংশে অনেক নবী আসে, সকলেই এই দ্বীনের অনুসারী ছিলেন এবং নিজ বংশধরদের এই দ্বীন পালন করার ওসিয়ত করে গেছেন। ইবরাহীম (আঃ) ইহুদী-খ্রিষ্টানদের মতো শিরকি আকিদা লালন করতেন না। মুসলিম হতে হলে সকল নবীর ওপরই ঈমান আনতে হবে।

    আল্লাহর আদেশে মুসলিমদের কিবলা বায়তুল আকসা থেকে পাল্টে মাসজিদুল হারামের দিকে নির্ধারিত হয়। কাফিররা এটা দেখে নিন্দা ছড়াতে থাকে যে মুসলিমরা একেকবার একেকদিকে ফিরে ইবাদাত করে। আল্লাহ এদের খণ্ডন করে বলেন যে পূর্ব-পশ্চিমে মুখ করার নাম ইবাদাত না, আল্লাহ যেটা করতে বলেন সেটাই ইবাদাত। আল্লাহর আদেশে কিবলা পরিবর্তন হয়েছে, এখন এদিকে ফিরেই সালাত আদায় করতে হবে। কিন্তু এই বিধানের পূর্বে আকসার দিকে ফিরে যেসব সালাত পড়া হয়েছে, তার সাওয়াবও নষ্ট হবে না।

    সালাত ও সবরের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার ফজিলত, শহীদদের মর্যাদা, দুনিয়াবি বিপদ আপদ পাঠানোর পেছনের হেকমত, এবং এসব পরিস্থিতিতে ইন্নালিল্লাহ…পড়ার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।

    মুশরিকরা হাজ্জ করার সময় সাফা-মারওয়ার মাঝে দৌড়াদৌড়ি (সাঈ) করত। সাহাবাগণ চিন্তিত ছিলেন যে এটা করা ঠিক হবে কিনা। আল্লাহ আয়াত নাযিল করে জানান এটা হাজ্জেরই অংশ এবং সাওয়াবের কাজ।

    যারা আল্লাহর কিতাবের কথা গোপন করে, তাদের ওপর লানত। তবে যারা এ পাপ থেকে তাওবাহ করেছে, তাদের কথা আলাদা। দুনিয়াতে কাফিররা তাদের নেতাদের অনুসরণ করার কারণে আখিরাতে যে আযাব পাবে, তার ফলে এই অনুসরণের ব্যাপারে তারা আফসোস করবে। বাপ-দাদার অন্ধ অনুসরণ ত্যাগ করে আল্লাহর আদেশ মানতে বলা হয়।

    হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার করতে বলে হারাম খাদ্যের তালিকা বর্ণনা করা হয়। আসমান-যমীন সহ পুরো সৃষ্টিজগতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শনের কথা বর্ণনা করা হয়।

    কিসাস (খুনের বদলা), সম্পদের উইল, ফরজ রোজা, রোজার কাফফারা, রমজানের ফজিলত, রমজানের রাতে সহবাস করা, চাঁদ দেখে মাস গণনা, জিহাদ, হাজ্জ-উমরাহ সংক্রান্ত বিবিধ বিধান বর্ণনা করা হয়।