Category: তারাবীহ

  • আজকের তারাবীহ: ১৭ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ১৭ রমাদ্বান

    ২৭। সূরা নামল, আয়াত ৬০ থেকে ৯৩

    আল্লাহর বিভিন্ন নিয়ামাতের কথা স্মরণ করিয়ে বারবার জিজ্ঞেস করা হয়েছে কী করে অন্য কোনো ইলাহ থাকতে পারে। বৃষ্টিবর্ষণ, উদ্ভিদ জন্মানো, বসবাসের পৃথিবী, পাহাড়, পৃথক পৃথক জলাধার সৃষ্টি, দোয়া কবুল করা, বৃষ্টিবাহী বায়ু প্রেরণ, রিযিক সরবরাহ। আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েবের জ্ঞান রাখে না, তিনিই আখিরাতে পুনঃসৃষ্টি করতে সক্ষম।

    কাফিররা আখিরাতের পুনরুত্থান অবাস্তব মনে করে। বলে যে এসব কিসসা কাহিনী তাদের বাপদাদাদেরকেও শোনানো হতো। এসকল কাফিরদেরকে বলা হয় জমিনে ভ্রমণ করে অপরাধী জাতিগুলোর পরিণাম দেখে নিতে। তারা প্রতিশ্রুত আযাব নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ করে, অথচ হয়তো সত্যিই আযাবের সময় নিকটে চলে এসেছে। আল্লাহ দয়ালু বলেই এখনো সুযোগ দিয়ে রেখেছেন। গুপ্ত ও প্রকাশ্য সকল বিষয় আল্লাহর জানা। রাসূলের (সাঃ) আগমন আহলে কিতাবদের নিকট একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ। তবু যারা আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করে, তাদেরকে বধির, মৃত ও অন্ধের সাথে তুলনা করা হয়। কিয়ামাত নিকটে চলে আসলে আলামত হিসেবে জমিন থেকে কোনো একটি প্রাণী বের করা হবে যা তাদের সাথে কথা বলবে। (কিছু রেওয়ায়ত থেকে জানা যায় এ ঘটনার পর ঈমান আনলে আর তা গৃহীত হবে না।)

    কিয়ামাতের দিন প্রত্যেক উম্মত থেকে কাফিরদের দলগুলোকে এনে সমবেত করা হবে। সেদিন এরা ঘাবড়ানো অবস্থায় থাকবে। ঈমানদার নেকআমলকারীরা ভয়ভীতি থেকে মুক্ত থাকবে। আজ যে পাহাড়গুলো নিশ্চল দেখা যাচ্ছে, শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়ার পর তারা মেঘের মতো সঞ্চালিত হবে। যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথে আসলো, সে নিজের কল্যাণার্থেই আসলো।

    ২৮। সূরা ক্বাসাস

    সূরা ক্বাসাস শুরু হয়েছে মূসা (আঃ) এর শুরুর দিকের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে। ফিরআউন বনী ইসরাইলের পুত্র সন্তানদের মেরে ফেলতো। মূসার জন্মের পর তাঁর মা পেরেশান হয়ে যান। আল্লাহ তাঁকে ইলহাম করেন তিনি যেন শিশুটিকে দুধ পান করাতে থাকেন, আর আল্লাহর নির্দেশ আসলে নদীতে ফেলে দেন। কথামতো কাজ করার পর ফিরআউনের লস্কর শিশু মূসাকে তুলে নেয়। তারা বুঝতে পারেনি এ শিশু তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হবে। ফিরআউন তার স্ত্রী আসিয়া (আঃ) এর অনুরোধে শিশু মূসাকে রেখে দেয়। মূসা (আঃ) বড় হলে আল্লাহ তাঁকে হিকমত ও জ্ঞান দান করেন।

    এক কিবতী আর এক ইসরাইলীকে ঝগড়া করতে দেখে মূসা (আঃ) কিবতীকে আঘাত করেন, এতেই সে মরে যায়। মূসা (আঃ) আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেন। মূসা (আঃ) বলেন, আল্লাহ যেহেতু একবার তাঁকে মাফ করেছেন, তিনি আর কখনো জালিমদের সহযোগী হবেন না।

    পরদিন ওই ইসরাইলীকে আরেক কিবতীর সাথে ঝগড়া করতে দেখা যায়। সে মূসাকে (আঃ) সাহায্যের জন্য ডাকে। ওই ইসরাইলীই যে আসল ঝামেলা পাকানো লোক, তা মূসা (আঃ) বুঝতে পারেন ও তাকে তা বলেন। তারপরও কিবতীর বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে হাত বাড়ান। ইসরাইলী ভাবে তাকেই মারতে আসছে। সে মূসাকে (আঃ) অকৃতজ্ঞের মতো তিরস্কার করে। শহরের দূর প্রান্ত থেকে এক লোক এসে খবর দেয় যে গতকালের হত্যার বদলা নিতে নেতারা মূসাকে (আঃ) খুঁজছে।

    মূসা (আঃ) পালিয়ে মাদায়েনে আসেন। সেখানে একদল রাখাল তাদের পশুদের পানি পান করাতে কুয়ো থেকে পানি নিতে ভিড় করে ছিল। দুজন নারী তাদের পশুগুলো নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মূসা (আঃ) জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন তাঁদের পিতা অতিবৃদ্ধ বলে পশু চরাতে পারেন না। আর ঠেলাঠেলির কারণে নারীদ্বয়কে সবার পরে পানি নেওয়া লাগে। মূসা (আঃ) তাঁদেরকে পানি সংগ্রহ করে দেন।

    তারপর তিনি এক জায়গায় বসে দু’আ করেন, আল্লাহ তাঁকে যে অনুগ্রহই করবেন, তিনি তার মুখাপেক্ষী। নারীদ্বয়ের একজন যথাযথ লজ্জাশীলতা বজায় রেখে এসে বলেন তাঁর পিতা দেখা করতে চান। দেখা করার পর ওই বৃদ্ধ ব্যক্তি মূসা (আঃ) এর সাথে এক মেয়ের বিয়ে দিতে চান এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে তাঁর জন্য কাজ করতে বলেন। মূসা (আঃ) রাজি হন।

    মেয়াদ শেষে স্ত্রী সহ মিশরে ফেরার পথে তূর পাহাড়ে নবুওয়ত ও মু’জিযা প্রাপ্তি, মিশরে গিয়ে ফিরআউনকে দাওয়াত দেওয়া পর্যন্ত ঘটনা বর্ণিত হয়। ফিরআউন ঠাট্টা করে তার পরিষদ হামানকে বলে, আমার জন্য উঁচু ইমারত বানাও তো, আসমানে উঁকি মেরে মূসার রবকে দেখে আসি! পরের ঘটনাচক্রে ফিরআউন ও তার লস্কর সাগরে নিমজ্জিত হয়। আর আখিরাতের শাস্তি তো কঠিনতর।

    এসব ঘটনা রাসূল (সাঃ) জানতেন না, আল্লাহ ওয়াহী করে জানিয়েছেন। মক্কার মুশরিকরা মু’জিযা দেখতে চাইত। অথচ ফিরআউন এত বড় দুটি মু’জিযা দেখেও ঈমান আনেনি। মুশরিকদের বলা হয় তাওরাত ও কুরআনের চেয়ে বেশি হিদায়াত সম্পন্ন কোনো কিতাব রচনা করে আনতে, কিন্তু তারা যে তা করতে অপারগ, তা তো জানা কথা।

    আল্লাহ একের পর এক হিদায়াত পাঠান। এক কিতাবে ঈমান রাখা অবস্থায় যারা পরবর্তী নবীর প্রতি ঈমান আনে, তাদের জন্য দ্বিগুণ পুরষ্কার। অনেকে বলত ঈমান আনলে জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। অথচ কাফিররা যে বিত্ত বৈভবে আছে, তা অল্প কয়েকদিনের নিরাপত্তা মাত্র। বরং আল্লাহ বিরান মক্কাভূমিতেও সমস্ত জীবনোপকরণের ব্যবস্থা করাচ্ছেন। আগে কত জাতি কুফরি করে ধ্বংস হয়ে গেছে! আখিরাতের প্রতিদানই স্থায়ী।

    কিয়ামাতের দিন আল্লাহ সেসব সত্ত্বাকে উপস্থিত করতে বলবেন, যাদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করা হতো। তারা তাদের উপাসকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্নতার ঘোষণা দেবে।

    কাফিররা বলত তাদের মাঝ থেকে কোনো বিত্তবানকে নবী বানানো হলো না কেন। জবাবে বলা হয়, আল্লাহ যাকে চান তাকেই নবুওয়ত দিবেন, অন্য কারো ইখতিয়ার নেই।

    আল্লাহ আমাদের কল্যাণার্থে রাত আর দিনের বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন। তিনি যদি কোনো একটিকে কিয়ামাত পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, কোনো মিথ্যা উপাস্য তা পরিবর্তন করতে পারবে না।

    কারুনের ঘটনা বর্ণিত হয়। সে বনী ইসরাইলের একজন। তার সম্পদের চাবিগুলো বহন করতেও একদল শক্তিশালী লোক লাগত। অথচ সে নিজ সম্প্রদায়ের ওপরই জুলুম করত। তাকে নসিহত করা হলো অহংকার না করতে, আল্লাহর দেওয়া নিয়ামাতের শোকরগুজার হতে, এ সম্পদ দিয়ে দুনিয়া ও আখিরাত কামাই করতে। সে বলত, এসব সম্পদ সে নিজ জ্ঞানবলে অর্জন করেছে। দুনিয়ালোভীরা আশা করত, ইশ আমরাও যদি কারুনের মতো ধনী হতাম! ঈমানদাররা তাদের ধিক্কার দিত ও আখিরাতের প্রতিদানের কথা বলত। কারুন ও তার প্রাসাদকে আল্লাহ ভূগর্ভে ধসিয়ে দেন। কালকেই যারা তার মতো হতে চাইছিল, তারাই কারুনের মতো হতে না পারায় খুশি হয়ে গেল।

    এ সূরা নাযিলের সময় মুসলিমরা হিজরত করা শুরু করেছিলেন। তাঁদেরকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে তাঁদেরকে এ ভূমিতে আবার ফিরিয়ে আনা হবে। তা যদি অকল্পনীয় হয়ে থাকে, এর আগে রাসূল (সাঃ) এর নবুওয়ত প্রাপ্তিও তো এক অপ্রত্যাশিত নিয়ামাত ছিল। কাজেই চিন্তার কিছু নেই।

    ২৯। সূরা আনকাবুত, আয়াত ১ থেকে ৪৪

    মক্কার মুশরিকদের উৎপীড়নে অতিষ্ঠ মুমিনদেরকে সূরা আনকাবুতের শুরুতে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় যে, ঈমান এনেছি বললেই পার পাওয়া যাবে না। পূর্ববর্তী উম্মতদেরকেও আল্লাহ বিপদআপদের মধ্য দিয়ে পার করিয়ে প্রকৃত ঈমানদারদের বের করে এনেছেন।

    মুশরিক পিতামাতারা তাদের মুসলিম সন্তানদেরকে দ্বীন ত্যাগ করার জন্য চাপ দিত। এ প্রসঙ্গে বলা হয় পিতামাতার আনুগত্য ও সদাচরণ করতে হবে ঠিক, কিন্তু তারা শির্কের দিকে ডাকলে সে কথা মানা যাবে না।

    সুসময়ে দ্বীন মানা আর দুঃসময়ে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার স্বভাবকে তিরস্কার করা হয়েছে।

    কাফিররা মুসলিমদের বলত দ্বীন ত্যাগ করলে কোনো বিপদ যদি আসেই, তাহলে তারাও তাদের সাথে তা ভাগ করে নেবে। আল্লাহ জানিয়ে দেন, বরং কাফিররাই নিজেদের প্রাপ্য আযাব ভোগ করবে, সেই সাথে যাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে তাদের আযাবের অংশও ভোগ করবে।

    নূহ (আঃ), ইবরাহীম (আঃ), লূত (আঃ), হুদ (আঃ), সালিহ (আঃ), শুআইব (আঃ) ও মূসা (আঃ) কর্তৃক দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে দুঃখকষ্ট ভোগ করার ঘটনা সংক্ষেপে বলা হয়। তারপর তাঁদের শত্রুদের ওপর এমন আযাব এসেছে যে, পার্থিব জীবনের অল্প সময়ের ভোগবিলাস তাদের কোনো উপকারে আসেনি। এর মাঝেই ইবরাহীম (আঃ) ও লূত (আঃ) এর হিজরত এবং হিজরতের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ লাভের ঘটনা বলে মুমিনদের হিজরতে উৎসাহিত করা হয়। আল্লাহকে ছেড়ে যারা অন্য অভিভাবক গ্রহণ করেছে, তারা যেন মাকড়সার (আনকাবুত) ঘরের মতো দুর্বল ঘর বানিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে।

  • আজকের তারাবীহ: ১৬ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ১৬ রমাদ্বান

    ২৫। সূরা ফুরক্বান, আয়াত ২১ থেকে ৭৭

    কাফিররা চায় আল্লাহ নিজে অথবা ফেরেশতা এসে যেন তাদের ঈমান আনতে বলে। কিন্তু এ ঘটনা যেদিন সত্যিই ঘটবে, তারা হাত কামড়াবে আর চাইবে এমনটা যেন না ঘটে। কিয়ামাতের দিন এক মেঘে আল্লাহ আসবেন (যেভাবে ‘আসা’টা তাঁর শানের উপযোগী, সেভাবে। এই ‘আসা’র স্বরূপ প্রকৃতি আমাদের অজানা) আর সকল আসমানের ফেরেশতারা আসবেন এবং বিচার শুরু হবে। কাফিররা হা-হুতাশ করবে, হায় আমি যদি নবীকে মানতাম, যদি অমুককে বন্ধু না বানাতাম!

    শয়তান এমন এক বন্ধু যে দরকারের সময় ছেড়ে যায়। নবীগণ কাফিরদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন।

    কুরআনকে অল্প অল্প করে নাযিল করার হিকমাহ বর্ণিত হয়।

    পূর্বেকার কিছু জাতির নাফরমানির পরিণতি সংক্ষেপে বলা হয়। আযাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত কিছু জনপদের উপর দিয়ে মক্কাবাসীদের চলাফেরা করা লাগে। তবু এসব নিদর্শন তাদের মনে আল্লাহভীতি জাগায় না।

    কাফিরদের কুফরির কারণে রাসূল (সাঃ)-কে অতিরিক্ত মনোঃকষ্ট পেতে নিষেধ করা হয়। এরা চতুষ্পদ জন্তুরও অধম।

    মানুষের প্রতি আল্লাহর বিভিন্ন নিয়ামাত সূর্যের আবর্তন, দিন-রাত, রোদ-ছায়া, বৃষ্টিবাহী বায়ু, পানিচক্র, মিঠা ও লোনা পানির মাঝে অদৃশ্য আড়াল ইত্যাদির কথা স্মরণ করানো হয়েছে।

    রাসূল (সাঃ) সুসংবাদদতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তিনি কোনো পার্থিব প্রতিদান চান না।

    কাফিররা আল্লাহকে স্বীকার করে। কিন্তু তাঁর সিফাতি নামগুলো অস্বীকার করে। ‘রহমান’ নাম উল্লেখ করলে তারা আপত্তি জানায়।

    রহমানের বান্দাদের কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়- নম্র চলাফেরা, অজ্ঞদের সাথে তর্ক না করা, সালাত আদায়, দু’আ করা, অপব্যয় ও কৃপণতার মাঝামাঝি পথ অবলম্বন করা, শির্ক না করা, অন্যায় হত্যা না করা, ব্যভিচার না করা, অন্যায় কাজে না জড়ানো, অর্থহীন কাজকারবার থেকে গাম্ভীর্য বজায় রেখে সরে আসা, রবের নির্দেশ মন দিয়ে শোনা, নেককার জীবনসঙ্গী ও সন্তানের জন্য দু’আ করা, মুত্তাকীদের নেতা হতে দু’আ করা। এরা জান্নাতে সুউচ্চ প্রাসাদের অধিকারী হবে।

    বান্দারা আল্লাহর ইবাদাত না করলে আল্লাহর কোনো ক্ষতি নেই, বান্দারই ক্ষতি।

    ২৬। সূরা শু’আরা

    কাফিররা নিত্যনতুন মু’জিযা দেখার দাবি জানায়। পূর্বেকার উম্মতরা কীভাবে মু’জিযা অস্বীকার করে ধ্বংস হয়েছে আর সৃষ্টিজগতে ছড়ানো নিদর্শন দেখেই কীভাবে ঈমান আনা যায়, তা বর্ণিত হয়েছে সূরা শু’আরায়।

    মূসা (আঃ) নবুওয়ত পেয়ে কথার জড়তা কাটানোর দু’আ করেন, হারুন (আঃ)-কেও নবুওয়ত দিয়ে তাঁর উজির বানানো হয়। তাঁরা ফিরআউনের কাছে গিয়ে তাওহীদের দাওয়াত দেন এবং বনী ইসরাইলকে মুক্তি দিতে বলেন। ফিরআউন মূসাকে লালনপালন করা ও তাঁর হাতে ভুলক্রমে একটি খুন সংঘটিত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে খোঁটা দেয়। মূসা (আঃ) অজ্ঞতার কারণে হত্যা করার কথা স্বীকার করেন এবং মনে করিয়ে দেন বনী ইসরাইলের উপর ফিরআউনের অত্যাচার এর চেয়ে বহুগুণে বেশি। ফিরআউন এবার মু’জিযা দেখতে চায়। তাকে লাঠি সাপে পরিণত হওয়া ও আলোকিত হাতের মু’জিযা দেখানো হয়। সে ভড়কে যায় যে মূসা (আঃ) জাদু করে তাদেরকে দেশ থেকে উৎখাত করবেন। সে সারা দেশের জাদুকরদের ডেকে নানা লোভ দেখিয়ে মূসার সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত করে। জাদুকররা ফিরআউনের নামে লাঠি-দড়ি ইত্যাদি নিক্ষেপ করে। মূসা (আঃ) তাঁর লাঠি নিক্ষেপ করলে তা সাপ হয়ে গিয়ে জাদুকরদের লাঠি-দড়িকে গিলে ফেলে। তাদের জাদু ও মূসার মু’জিযার পার্থক্য স্পষ্ট বুঝতে পেরে জাদুকররা ঈমান এনে সেজদায় পড়ে যায়। ফিরআউন রাগে দিশেহারা হয়ে বলে, মূসাই তোমাদের সর্দার। সে তোমাদের জাদু শিখিয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করাচ্ছে। ইত্যাদি। সে জাদুকরদের শাস্তির ভয় দেখায়। জাদুকররা ঈমানদীপ্ত জবাব দেয়। মূসা (আঃ) বনী ইসরাইলকে নিয়ে যাত্রা করেন। ফিরআউন তার বাহিনী নিয়ে ধাওয়া করে। এভাবে আল্লাহ ফিরআউন বাহিনীকে তাদের কমফোর্ট জোন থেকে বের করে আনেন। লোহিত সাগরের পাড়ে এসে বনী ইসরাইল ভাবে যে তারা ধরা পড়ে যাবে। মূসা (আঃ) আল্লাহর ওপর তাওয়াককুল করতে বলেন। আল্লাহ লোহিত সাগরে পথ করে দিয়ে বনী ইসরাইলকে পার করে নেন আর ফিরআউনের লস্করকে ডুবিয়ে মারেন।

    ইবরাহীম (আঃ) এর সাথে তাঁর কওমের মুশরিকদের বাদানুবাদ উল্লেখ করা হয়। মুশরিকরা দেবদেবীর উপাসনা করে, কারণ তারা তাদের বাপদাদাদের তা করতে দেখেছে। আর ইবরাহীম (আঃ) সৃষ্টিজগতের ওপর আল্লাহর সর্বব্যাপী ক্ষমতার উল্লেখ করে কল্পিত দেবদেবী ও পূজারীদের সাথে শত্রুতা ঘোষণা করেন।

    কাফিরদেরকে তাদের মিথ্যা দেবদেবীসহ উপুড় করে জাহান্নামে নেওয়া হবে (যেসব নবী, ফেরেশতা ও বুজুর্গদের উপাসনা করা হয়, তাঁরা এর অন্তর্ভুক্ত নন)। সেখানে তারা নিজেদের নেতাদের দোষারোপ করতে থাকবে আর মুমিন না হওয়ার কারণে আফসোস করতে থাকবে।

    নূহ (আঃ) তাঁর কওমকে দাওয়াত দিলে সেখানকার নেতারা খোঁটা দেয় যে নূহের সাথে কেবল সমাজের নিচু স্তরের মানুষেরাই যোগ দেয়। তাদের অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ তাদেরকে নিমজ্জিত করেন এবং ঈমানদারদের রক্ষা করেন।

    আদ জাতিকেও হুদ (আঃ) একইভাবে বিনা পারিশ্রমিকে তাওহীদের দাওয়াত দেন। আদ জাতি অযথা দাপট দেখাতে বিভিন্ন সৌধ ও ইমারত বানাত যেন সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আর অন্যান্য জাতিকে জুলুম করত। হুদ (আঃ) স্মরণ করিয়ে দেন এসব ক্ষমতা প্রতিপত্তি পরীক্ষাস্বরূপ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা ঈমান আনতে অস্বীকার করে ধ্বংস হয়।

    সামুদ জাতিকে সালিহ (আঃ) একইভাবে দাওয়াত দেন। তারা তাদের প্রস্রবণ, বাগান, পাহাড় কেটে বানানো সুদৃঢ় আবাসে চিরকাল থাকবে- এরকম ধ্যান ধারণা নিয়ে চলত। সালিহ (আঃ)-কে তারা জাদুগ্রস্ত আখ্যায়িত করে। মু’জিযাস্বরূপ আনীত উটনীকে হত্যা করে ফেলে। সালিহ (আঃ)-কেও হত্যার পরিকল্পনা করে। ফলে তারা আযাবে নিপতিত হয়।

    লূত (আঃ) একইভাবে তাঁর কওমকে দাওয়াত দেন ও সমকামিতা হতে বিরত থাকতে বলেন। তারা হঠকারিতা দেখায়। পাথরবৃষ্টির মাধ্যমে তাদের সকলকে ধ্বংস করা হয়। লূত (আঃ) এর স্ত্রী তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলা হওয়ায় সেও আযাবে পতিত হয়।

    আয়কা (মাদইয়ান) এর অধিবাসীদের শুআইব (আঃ) একইভাবে দাওয়াত দেন, মাপে কমবেশি করে লোক ঠকাতে ও দস্যুবৃত্তি করতে নিষেধ করেন। তারা তাঁকে জাদুগ্রস্ত বলে এবং নিজেদের মতোই একজন মানুষকে নবী মানতে অস্বীকার করে। প্রতিশ্রুত আযাব নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ করে। ফলে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

    কাফিররা দাবি করত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর কাছে শয়তান এসব বাণী নিয়ে আসে। অথবা তিনি কোনো কবি। তাদেরকে খণ্ডন করে বলা হয় এখানে যেসকল উত্তম কথাবার্তা বলা আছে, এগুলো তো শয়তানের ঘোর অপছন্দের জিনিস। শয়তান বরং নাযিল হয় মিথ্যাবাদী পাপিষ্ঠদের ওপর। আসলে কাফিররা ঈমান না আনার প্রতিজ্ঞা করে বসে আছে। কোনো অনারব এসেও যদি তাদের সামনে আরবি কুরআন শুনিয়ে দিত, তবু তারা ঈমান আনত না। বনী ইসরাইলের আলেমরা জানে যে তাদের কিতাবে এই কুরআনের ব্যাপারে বলা আছে। আর কবিরা তো কেবল কাল্পনিক কথাবার্তা বলে। যা বলে, নিজেরাই তা করে না। কুরআন তো এমন নয়। (তবে ইসলামের পক্ষে রচিত কবিতার কথা আলাদা। যেমন হাসসান বিন সাবিত (রাঃ) এরকম কবিতা লিখে কাফিরদের ইসলামবিদ্বেষী কবিতার জবাব দিতেন।)

    ২৭। সূরা নামল, আয়াত ১ থেকে ৫৯

    সূরা নামলের শুরুতে দুইটি এমন জাতির পার্থক্য দেখানো হয়েছে যারা সম্পদ-রাজত্ব-প্রতিপত্তি নিয়ে দুই রকমের আচরণ করেছে। প্রথমে মূসা (আঃ) কর্তৃক ফিআউনের কাছে দাওয়াহ প্রদান ও তার প্রতি ফিরআউনের কুফরির ঘটনা বলা হয়। শয়তানের প্ররোচনায় দুনিয়াবি চাকচিক্যকে তারা উত্তম মনে করেছিল। ফলে আল্লাহর আয়াতের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে।

    অপরদিকে সুলায়মান (আঃ) ছিলেন সাচ্চা তাওহীদবাদী। তাঁকে জ্বীন, মানুষ ও পাখির এক বিশাল সেনাবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়। পশুপাখির কথা বোঝার ক্ষমতা দেওয়া হয়। এক পিঁপড়ার উপত্যকার কাছে দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি শুনতে পান একটি পিঁপড়া তার জাতিকে বলছে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে, নাহলে সুলাইমানের বাহিনী তাদের পিষ্ট করে ফেলতে পারে। সুলাইমান (আঃ) স্মিত হেসে ফেলেন, আল্লাহর কাছে দু’আ করেন শোকরগুজার ও নেককার বান্দা হওয়ার জন্য।

    তাঁর কাছে হুদহুদ পাখি সাবা রাজ্যের খবর নিয়ে আসে। সেখানকার শাসক ছিলেন এক রাণী (বিলকিস) আর সে জাতি ছিলো সূর্যপূজারী। সুলাইমান (আঃ) বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু করা একটি চিঠি পাঠিয়ে তাদের তাওহীদ গ্রহণ করার আদেশ দেন এবং আত্মসমর্পণ করে তাঁর দরবারে আসতে বলেন। বিলকিস তাঁর সভাসদদের সাথে পরামর্শ করেন। তারা বলে যে তারা লড়াকু জাতি, রাণী যদি সুলাইমানের সাথে যুদ্ধের আদেশ দেন, তাহলে তারা প্রস্তুত আছে। রাণী বরং যুদ্ধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে সুলাইমানের নিকট উপঢৌকন সহ দূত পাঠান। সুলাইমান (আঃ) বলে দেন যে আল্লাহ তাঁকে যা দিয়েছেন, তা এরচেয়ে উত্তম।

    বিলকিস সুলাইমানের দরবারে আসার জন্য রওনা দেন। বিলকিসের সিংহাসনটি সুলাইমান (আঃ) নিজ দরবারে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেন। একজন শক্তিশালী জ্বীন এ কাজে রাজি হয়। তবে তার আগেই আসমানী কিতাবের জ্ঞানধারী এক ব্যক্তি আল্লাহপ্রদত্ত বিশেষ ক্ষমতায় এ কাজটি সম্পাদন করে দেন। সুলাইমান (আঃ) সিংহাসনটির আকৃতি কিছুটা পরিবর্তন করে দেন। বিলকিস এসে চিনতে পারেন যে তাঁর সিংহাসন তিনি আসার আগেই এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। এছাড়া তিনি সুলাইমানের প্রাসাদের স্বচ্ছ কাঁচনির্মিত মেঝে দেখেন, যা দেখলে জলাশয় মনে হয়। তাওহীদের প্রতি আগেই তাঁর মন ঝুঁকি গিয়েছিল। সুলাইমানের সম্পদ-প্রতিপত্তি দেখে আরো ঈমান বৃদ্ধি পায়। এভাবে সুলাইমান ও বিলকিস প্রচুর ক্ষমতার মালিক হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর দ্বীনের সাথে কোনো অহংকার প্রদর্শন করেননি।

    সালিহ (আঃ) এর ঘটনা পূর্বের মতোই বর্ণিত হয়। নয়জন লোক যে উটনী হত্যায় ভূমিকা পালন করে, তা বলা হয়। লূত (আঃ) এর ঘটনা পূর্বের মতো বলা হয়। তাঁর কওম তাঁর দাওয়াহ শুনে বলেছিলো এদেরকে এখান থেকে বের করে দাও, এরা তো বেশি পাকপবিত্র থাকতে চায়!

  • আজকের তারাবীহ: ১৫ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ১৫ রমাদ্বান

    ২৩। সূরা মুমিনুন

    জান্নাত লাভকারী সফল মুমিনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে- বিনীতভাবে সালাত আদায়কারী, অনর্থক বিষয়ে নির্লিপ্ত, যাকাতদাতা, লজ্জাস্থান হেফাজতকারী, আমানতদার, প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী, সালাতের রক্ষণাবেক্ষণকারী।

    প্রথমে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি, তারপর মাতৃগর্ভে মানুষের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন আল্লাহর কুদরত। তিনি আখিরাতেও এসব পুনঃসৃষ্টি করতে সক্ষম।

    বৃষ্টির পানি জমিনে সংরক্ষণ, উদ্ভিদ ও গবাদি পশু থেকে প্রাপ্ত উপকার এবং নৌযানের নিয়ামাত স্মরণ করানো হয়েছে।

    পরপর কয়েকজন নবীর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে- নূহ, নাম অনুল্লেখিত একজন, মূসা, হারুন, ঈসা (আলাইহিমুসসালাম)। তাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী নিয়ে তাঁদের কওমকে দাওয়াত দিলে কওমের নেতারা তাঁদেরকে পাগল আখ্যায়িত করত। ফেরেশতার বদলে একজন মানুষ কেন নবী হলেন তা নিয়ে ঠাট্টা করত। আখিরাতের ধারণাকে অবাস্তব আখ্যায়িত করত, অহংকার করত। কোনো কওমের নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ এদের এমন আযাব দিয়ে ধ্বংস করেন যে, এরা কেবল গল্প-ইতিহাস হয়ে যায়। সে জায়গায় নতুন কওমের বিস্তার করা হয় এবং তাদের পরীক্ষা শুরু হয়।

    নবীগণ একই দ্বীন প্রচার করেছেন। কাফিররা নানা মতাদর্শ উদ্ভাবন করে নিজ নিজ মতাদর্শ নিয়ে খুশিতে আছে। কাফিররা নিজেদের অর্থবিত্তের প্রাচুর্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলে তারাই সঠিক পথে আছে। আল্লাহ জানিয়ে দেন যে দুনিয়াবি প্রাচুর্য হক-বাতিলের মানদণ্ড নয়। এসব ঐশ্বর্যশালী লোকদের যখন আযাবে পাকড়াও করা হবে, তারা দিশাহারা হয়ে যাবে। তাদেরকে সংকট ও প্রাচুর্য উভয় অবস্থা দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে, কখনোই তারা আল্লাহর দিকে ফেরে না।

    রাসূলকে (সাঃ) দীর্ঘদিন চেনার পরও তাঁর ওপর পাগল, লোভী ইত্যাদি অপবাদ আরোপ করে কাফিররা যে স্ববিরোধিতামূলক কথা বলত, তা খণ্ডন করা হয়েছে।

    মুশরিকরা সৃষ্টিকর্মে আল্লাহকেই একক মানতো। কিন্তু আল্লাহরই হুকুম তাওহীদ ও আখিরাতের বিশ্বাসকে তারা অস্বীকার করে। বলে যে এসব হুমকি তাদের বাপদাদাদের কাছেও এসেছে, এসব আদিকালের উপকথা মাত্র। একাধিক ইলাহ থাকলে যে তারা পরস্পর বিবাদ করে সৃষ্টিজগত বিশৃঙ্খল করে ফেলত, তা উল্লেখ করে তাদের শিরকি আকিদার অসারতা দেখানো হয়েছে। মন্দকে উত্তম দিয়ে প্রতিহত করতে বলা হয়েছে।

    আল্লাহ চাইলে সাথে সাথেই আযাব দিয়ে কাফিরদের ধ্বংস করতে পারেন। কিন্তু তিনি তা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বিলম্বিত করে পরীক্ষা নেন। কিয়ামাত দিবসে এমন বিপদ হবে যে কেউ কারো আত্মীয়তার খবর রাখবে না। কাফিররা দুনিয়ায় আল্লাহর বিধান ও মুমিনদের উপহাস করত। জাহান্নামে ঝলসানোর সময় তারা দু’আ করবে তাদের যেন দুনিয়ায় আবার ফেরত পাঠানো হয়, এবার তারা নেক আমল করবে। এটা আসলে মুখের কথা। তাদের পুনরায় পাঠালেও তারা বদ আমলই করত। শাস্তির দীর্ঘতা উপলব্ধি করে তাদের কাছে মনে হবে দুনিয়ার সুখশান্তিতে তারা একদিন বা তারও কম সময় ছিল। কতই না ভালো হতো যদি তারা তা আগেই উপলব্ধি করত।

    মুমিনদেরকে হুকুম করা হয় আল্লাহর মাগফিরাত ও রহমত কামনা করে দু’আ করতে।

    ২৪। সূরা নূর

    সূরা নূরের শুরুতে ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর শাস্তি, তাদের বিবাহের বিধান, সতী নারীর ওপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপকারীর শাস্তির বিধান, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে লিআন-এর বিধান আলোচিত হয়।

    বনু মুস্তালিকের যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে এক ঘটনায় মুনাফিকরা আয়িশা (রাঃ) এর উপর ব্যভিচারের অপবাদ দেয়। এটি ‘ইফক’ এর ঘটনা নামে খ্যাত। এ ঘটনার আলোকে মিথ্যা অপবাদের ভয়াবহতা, মুখে মুখে গুজব ছড়ানোর ভয়াবহতা, প্রমাণবিহীন অপবাদ কানে আসলে মুমিনদের করণীয়, মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতার প্রসার কামনার ভয়াবহতা বর্ণিত হয়েছে।

    মুনাফিকদের অপপ্রচারে যেসকল সরলমনা মুসলিম বিভ্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের একজনকে আবু বকর (রাঃ) আর্থিক সাহায্য করতেন। এ ঘটনার পর তিনি তাঁকে আর সাহায্য না করার ব্যাপারে কসম করে ফেলেন। ব্যক্তিগত শত্রুতার জের ধরে অপর মুমিনকে সাহায্য বন্ধ করে দেওয়ার এ আচরণ আল্লাহ নিষেধ করেন। ফলে আবু বকর (রাঃ) আর্থিক সাহায্য প্রদান জারি রাখেন।

    দুশ্চরিত্র নারী-পুরুষ পরস্পরের উপযুক্ত আর সচ্চরিত্র নারী-পুরুষ পরস্পরের উপযুক্ত।

    অন্যের ঘরে ঢুকতে অনুমতি নেওয়ার বিধান বর্ণনা করা হয়। নারী-পুরুষের পর্দার বিধান, কাদের সামনে পর্দা করতে হবে না তার বিধান আলোচিত হয়। বিবাহের গুরুত্ব, অভাবগ্রস্ত অবস্থায় বিবাহের বিধান বর্ণিত হয়। জাহিলি যুগে মনিবরা দাসীদের দিয়ে বেশ্যাবৃত্তি করিয়ে টাকা রোজগার করত, এটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

    আল্লাহর নূরের ব্যাপারে একটি চমৎকার উপমা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ যাকে চান, তাঁর নূরের দিকে পথ দেখান। এসব লোকের চাকরি-ব্যবসা তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করতে পারে না। আল্লাহ তাদের যথাযথ প্রতিদান দেবেন। আর কাফিরদের কাজগুলো হলো মরিচীকার মতো, অথবা সাগরতলের কয়েক স্তরের আঁধারের মতো, যার কোনো ভালো প্রতিদান নেই।

    সমগ্র সৃষ্টিজগত আল্লাহর শেখানো তরিকায় নিজ নিজ জায়গায় আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করে।

    মুনাফিকরা মুখে ঈমানের দাবি করে। যখন নিজের সুবিধা দেখে, তখন কুরআন-সুন্নাহর বিচার মানে। আর তাদের স্বার্থের বিপরীতে গেলে কুরআন-সুন্নাহর ফায়সালা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। মুমিনরা তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম শুনলেই মেনে নেয়।

    যখন জিহাদ থাকত না, তখন মুনাফিকরা কসম করে বলত জিহাদের ঘোষণা আসলে তারা বের হবে। অথচ আসল সময়ে নানা অজুহাত দেয়।

    ঈমানদার ও নেক আমলকারীরা জুলুম-অত্যাচারের যুগ কাটিয়ে একদিন নিরাপত্তার সহিত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে- এ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

    ঘরে প্রবেশের সময় অনুমতি নেওয়ার আরো কিছু বিধান, একত্রে ও আলাদা খাওয়ার বিধান ও সালামের ফজিলত বর্ণিত হয়।

    খন্দক যুদ্ধের প্রস্তুতির সময় রাসূল (সাঃ) সবাইকে কাজ ভাগ করে দেন। মুমিনগণের কোনো দরকার পড়লে রাসূলের (সাঃ) অনুমতি নিয়ে যেতেন। আর মুনাফিকরা এমনি এমনিই ফাঁকি দিয়ে সটকে পড়ত। এ ঘটনার আলোকে রাসূলের (সাঃ) নির্দেশ মানার গুরুত্ব, অনুমতি নেওয়া ও দেওয়ার বিধান আলোচিত হয়।

    ২৫। সূরা ফুরক্বান, আয়াত ১ থেকে ২০

    সূরা ফুরক্বানের শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করে বলা হয় যে তিনি রাসূলের (সাঃ) এর ওপর ফুরক্বান [(সত্য-মিথ্যার মাঝে) পার্থক্যকারী মানদণ্ড] নাযিল করেছেন।

    আল্লাহকে ছেড়ে এমন উপাস্য গ্রহণ করাকে তিরস্কার করা হয়, যারা নিজেরই কোনো উপকার-অপকারের ক্ষমতা রাখে না।

    কাফিররা এত রকমের অভিযোগ তুলত যে তারা নিজেরাই জানে না কোনটা সঠিক। একবার বলে কোনো ইহুদী রাসূলকে (সাঃ) এসব শেখায়, একবার বলে তিনি যাদুগ্রস্ত, একবার বলে এ কেমন রাসূল যে খাবার খায়-হাটবাজারে যায়, তাঁকে আল্লাহর ধনভাণ্ডার দেওয়া হলো না কেন ইত্যাদি। অথচ আগের নবীগণও মানুষ ছিলেন।

    আল্লাহ চাইলেই যাকে-তাকে অকল্পনীয় ধনভাণ্ডার দিতে পারেন। কিন্তু আসল প্রতিদান তো আখিরাতে। সেখানে কাফিররা জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করতে করতে মৃত্যুকে ডাকবে। কিন্তু তারা মরবেও না, শাস্তিও কমবে না। বিপরীতে মুত্তাকীরা পাবে স্থায়ী জান্নাত। কাফিররা যেসব মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করত, তারা নিজেরাই আখিরাতে তাদের উপাসকদের সাথে বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করবে।

  • আজকের তারাবীহ: ১৪ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ১৪ রমাদ্বান

    ২১। সূরা আম্বিয়া

    কাফিররা নিজেদের মাঝে বলাবলি করত আল্লাহ কেন নবী বানিয়ে পাঠানোর জন্য একজন মানুষকেই পেলেন! তাদের এই গোপন কানাকানির জবাবও আল্লাহ ওয়াহী নাযিল করে জানিয়ে দেন যে পূর্ববর্তী নবীগণও মানুষই ছিলেন। আহলে কিতাবগণও এ ব্যাপারে সাক্ষী। আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করার কারণেই আগের জাতিগুলো ধ্বংস করে নতুন জাতি আনা হয়েছে। এরাও সীমালঙ্ঘন করলে একই পরিণতি হবে।

    আল্লাহ উদ্দেশ্যহীনভাবে এ সৃষ্টিজগত তৈরি করেননি।

    একাধিক ইলাহ থাকলে সকলেই ধ্বংস হয়ে যেত। এক ইলাহ’র ব্যাপারে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে দলীল আছে। আর শির্কের পক্ষে কোনো দলীলই নেই। নবী ও ফিরিশতাগণকে যারা উলুহিয়াতের অংশীদার ভাবে, তাদের কথা খণ্ডন করে বলা হয় এঁরাও আল্লাহরই বান্দা। এদের কেউ যদি নিজেকে ইলাহ দাবি করেও বসতেন, তাঁকেও আল্লাহ জাহান্নামে দিতেন।

    মানুষের ওপর আল্লাহর বিবিধ নিয়ামাত পাহাড়, আসমান, চাঁদ, সূর্য, রাত, দিনের আবর্তনের কথা স্মরণ করানো হয়েছে।

    মুশরিকরা বলত একদিন না একদিন তো রাসূল (সাঃ) মারা যাবেন, তখন তারা উল্লাস করবে। তো তারা নিজেরা কি চিরকাল বেঁচে থাকবে নাকি? সকলেই তো মৃত্যুর স্বাদ পেয়ে বিচারের মুখোমুখি হবে।

    মুশরিকরা তাদের মিথ্যা ইলাহর সমালোচনা সহ্য করে না। অথচ নিজেরা ঠিকই আল্লাহর সিফাতি নামগুলো শুনলে রেগে যায়।

    পূর্বের নবীগণকেও ঠাট্টা বিদ্রুপ করা হয়েছে। বিদ্রুপকারীরা নিজেরাই তার ফল ভোগ করেছে।

    তাওহীদের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে মুশরিকদের প্রতিপত্তি ক্রমশ কমে আসছে, এই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে তাদের সাবধান করা হয়।

    কিয়ামাতের দিন মীযান স্থাপন করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আমলও পরিমাপ করা হবে।

    ইবরাহীম (আঃ) এর ঘটনা বিধৃত হয়। তিনি তাঁর কওমের মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেন। মুশরিকরা এক উৎসবের দিনে লোকালয় থেকে দূরে গেলে ইবরাহীম (আঃ) তাদের বড় মূর্তিটা ছাড়া বাকিগুলো ভেঙে ফেলেন। তারা ফিরে এসে দেখলে ইবরাহীম (আঃ)-কেই সন্দেহ করে। তিনি বলেন বড় মূর্তিকে জিজ্ঞেস করে দেখতে এ কাজ কে করেছে। এতে মুশরিকরা বিব্রত হয়ে যায়। অনেক আয়োজন করে ইবরাহীম (আঃ)-কে অগ্নিকুণ্ডে ফেলা হয়। আল্লাহর নির্দেশে আগুন স্বস্তিদায়ক ঠাণ্ডা হয়ে যায়। ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর ভাতিজা লূত (আঃ)-কে তাঁদের জালিম কওমের থেকে বাঁচিয়ে আল্লাহ তাঁদেরকে বরকতময় শাম-ফিলিস্তিন ভূমিতে নিয়ে যান এবং নেক সন্তান দ্বারা পুরষ্কৃত করেন।

    নূহ (আঃ) ও মুমিনগণকেও আল্লাহ নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা করেন।

    দাউদ ও সুলাইমান (আলাইহুমাসসালাম) উভয়কে আল্লাহ বিচারিক প্রজ্ঞা দিয়েছেন। একবার এক মেষপালকের মেষ এক কৃষকের ক্ষেতের ক্ষতি করে। দাউদ (আঃ) রায় দেন মেষপালক ক্ষতির সমমূল্যের মেষ কৃষককে দেবে। সুলায়মান (আঃ) রায় দেন যে, কৃষক মেষপালকের মেষগুলো লালন করবে ও তার দুধ থেকে উপকৃত হবে। আর মেষপালক কৃষকের জমি পরিচর্যা করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে। তারপর উভয় নিজ নিজ সম্পদ বুঝে নিবে। এই উভয় বিচারই সঠিক ছিল বলে আল্লাহ প্রশংসা করেন।

    দাউদ (আঃ) এর কণ্ঠের সাথে পাহাড় ও পাখিরাও আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করত। এছাড়া আল্লাহ দাউদের হাতে লোহাকে মোমের মতো নমনীয় করে দিতেন, ফলে তিনি সুচারুভাবে লৌহবর্ম বানাতেন। আল্লাহ সুলায়মান (আঃ) এর জন্য বাতাস ও কিছু দুষ্ট জিনদেরকে অনুগত করে দেন। বাতাস তাঁকে নিয়ে সহজে সফর করাত আর জিনেরা তাঁর জন্য ডুবুরির কাজ করত।

    আইয়ুব (আঃ) এর ভয়ানক রোগ হয়ে পরিবার-সম্পদ সব হারালে তিনি অত্যন্ত নম্র ভাষায় আল্লাহর কাছে দু’আ করেন। আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করে আগের চেয়েও বেশি নিয়ামাত ফিরিয়ে দেন।

    ইসমাইল, ইদরীস ও যুলকিফল আলাইহিমুসসালাম ছিলেন আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত।

    ইউনুস (আঃ) আল্লাহর অনুমতির আগেই তাঁর কওমকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় ঘটনাক্রমে মাছের পেটে যান। সেই অন্ধকারে তিনি আল্লাহর কাছে দু’আ করলে আল্লাহ তাঁকে নাজাত দেন।

    আল্লাহ যাকারিয়া (আঃ)-কে বৃদ্ধ বয়সে সন্তান ইয়াহইয়া (আঃ) দান করেন। সতীত্ব রক্ষাকারী মারইয়াম (আঃ)-কে রুহ ফুঁকে দিয়ে ঈসা (আঃ) এর জন্মের ব্যবস্থা করেন।

    এভাবে আল্লাহ যুগে যুগে নেক বান্দাবান্দীদের সম্মানিত করেছেন। এঁরা সকলে একই দ্বীন ইসলামের অনুসারী ছিলেন। কাফিররা সেই দ্বীনকে খণ্ডবিখণ্ড করে নতুন নতুন মতাদর্শ উদ্ভাবন করেছে। কিয়ামাতের দিন বইপত্রের মতো পৃথিবীকে গুটিয়ে ফেলা হবে। কাফিররা তাদের মিথ্যা উপাস্যসহ জাহান্নামে থাকবে। যাবুরে লেখা ভবিষৎবাণী বাস্তবায়িত হবে যে আল্লাহ শেষ পর্যন্ত মুমিনদেরকেই সৃষ্টিজগতের নিয়ামাতরাজির অধিকারী বানাবেন। তারা জান্নাত থেকে কাফিরদের কষ্টের মৃদু আওয়াজও শুনবে না, ফলে বিচলিতও হবে না। দুনিয়ায় কাফিরদেরকে এসকল সাবধানবাণী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হলো।

    ২২। সূরা হাজ্জ

    সূরা হাজ্জ শুরু হয়েছে কিয়ামাত দিবসের অন্তর কাঁপিয়ে দেওয়া বর্ণনার মাধ্যমে। আল্লাহ দুনিয়াতে যেভাবে নিষ্প্রাণ ভ্রূণ ও শুষ্ক মাটি থেকে মানুষ ও ফসল বের করে আনেন, তার উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হয়েছে আখিরাতের পুনরুত্থান বাস্তব।

    সুবিধা পেলে আল্লাহর ইবাদাত করে আর অসুবিধা দেখলে কুফরে ফিরে যায় এরকম ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত।

    সমগ্র সৃষ্টিরাজি আল্লাহকেই সেজদা করে। মুমিন, ইহুদী, নাসারা, সাবী, অগ্নিপূজক, মূর্তিপূজক সকলের ব্যাপারে আল্লাহ কিয়ামাতের দিন ফায়সালা করে দিবেন। কাফিরদের জন্য প্রস্তুতকৃত জাহান্নামের শাস্তির ভয়াবহ বর্ণনা দেওয়া হয়। মুমিনদের জন্য জান্নাতের নিয়ামাতের মনোলোভা বর্ণনা দেওয়া হয়।

    আল্লাহর নির্ধারিত পবিত্র স্থানে ইবরাহীম (আঃ) কা’বা নির্মাণ করেন। আল্লাহ একে মূর্তি থেকে পবিত্র রাখার জন্য এবং মুসলিমদের হাজ্জের জন্য পবিত্র রাখার নির্দেশ দেন। হাজ্জ, কুরবানি, কুরবানির পশুর ব্যবহার, আল্লাহর নাম নিয়ে জবাহ করা, গোশত খাওয়া ও ফকির মিসকীনদের খাওয়ানো সংক্রান্ত বিবিধ নিয়ম বর্ণিত হয়। আল্লাহর কাছে এসবের রক্ত-মাংস পৌঁছে না, পৌঁছে আমাদের তাকওয়া।

    জিহাদের অনুমতি দিয়ে প্রাথমিক আয়াত নাযিল হয়। এই ইবাদাতের দ্বারাই মুজাহিদদের হাতে জালিমদের ধ্বংস করার মাধ্যমে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের সংঘটন প্রতিরোধ করা যায়। এসকল নেক লোকদেরকে আল্লাহ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করলে তারা ন্যায়পূর্ণ সমাজ কায়েম করবে। পূর্বের নবীদেরকেও অস্বীকার করা হয়েছিল। ফলে অস্বীকারকারীরা আযাবে ধ্বংস হয়ে যায়। এভাবে কত কূয়া এবং বাসস্থান এখন বিরান পড়ে আছে! জালিমরা যেন এসব দেখে শিক্ষা নিয়ে সংশোধন হয়ে যায়।

    কিয়ামাতের দিন মুমিন ও কাফিরদের মাঝে আল্লাহ চূড়ান্ত ফায়সালা করে দিবেন।

    যেসকল মুহাজিরকে উৎপীড়ন করা হয়েছে, খুন করা হয়েছে, তাঁদের আখিরাতের চমৎকার প্রতিদানের কথা বর্ণিত হয়েছে। সৃষ্টিজগতের ওপর আল্লাহর সর্বব্যাপী ক্ষমতার বর্ণনা দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে আল্লাহর পক্ষে তা সহজ।

    মুহাম্মাদ (সাঃ) এর শরিয়তের কিছু ইবাদাতের বিধান পূর্ববর্তী নবীদের কিছু বিধান থেকে আলাদা। কাফিররা এটা দেখিয়ে ভুল ধরার চেষ্টা করত। আল্লাহ জানিয়ে দেন যে আল্লাহই এ বিধান করেছেন। আল্লাহর হুকুমেই কোনো একটা নিয়ম ইবাদাতের পদ্ধতি বলে গণ্য হয়, নাহলে এগুলো তো সত্ত্বাগতভাবে পবিত্র কিছু নয়।

    কাফিররা যেসবের উপাসনা করে তারা সকলে মিলে একটা মাছি তৈরি করতে পারে না, এমনকি মাছি তাদের থেকে কিছু নিয়ে গেলে তারা তা রোধ করতে পারে না। উপাস্য ও উপাসক উভয়ই দুর্বল।

    মুশরিকরা কুরআনের এসব কথা শুনে রেগে গিয়ে তেড়ে আসতে চায়। তাদেরকে তাই এরচেয়েও অপছন্দের বিষয় শুনিয়ে দেওয়া হয়- জাহান্নামের আগুন। মুমিনদের বলা হয় সালাত পড়তে, ইবাদাত করতে, নেক আমল করতে এবং যেভাবে জিহাদ করা উচিত সেভাবে জিহাদ করতে।

  • আজকের তারাবীহ: ১৩ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ১৩ রমাদ্বান

    ১৮। সূরা কাহফ, আয়াত ৭৫ থেকে ১১০

    আরো কিছুদূর যাওয়ার পর খাযির (আঃ) ও মূসা (আঃ) এমন এক জনপদে যান, যেখানকার লোকজন তাঁদের ভালো সমাদর করেনি। খাযির (আঃ) সেখানকার একটি পতনোন্মুখ প্রাচীর মেরামত করে দেন। মূসা (আঃ) আবারও অবাক হন যে পারিশ্রমিক ছাড়া তিনি এ কাজ করে দিলেন (অথচ কিছু আগে তাঁদের উপকার করা একটা নৌকাকে ফুটো করে দিলেন)!

    খাযির (আঃ) বলেন এবার আর তিনি মূসাকে (আঃ) তাঁর সাথে রাখবেন না। কারণ প্রতিজ্ঞা করার পরও তিনি তিনটি ঘটনায়ই ধৈর্য হারিয়ে প্রশ্ন করে বসেছেন। এবার খাযির (আঃ) তিনটি ঘটনার ব্যাখ্যা দেন। এক অত্যাচারী রাজা ছিল, যে ভালো নৌকা দেখলে তা নিয়ে নিত। তাই তিনি সেই নৌকাটিকে ত্রুটিপূর্ণ করে দিয়েছিলেন। এছাড়া যে বালকটিকে হত্যা করলেন, সে বড় হয়ে তার মুমিন পিতামাতাকে ফিতনায় ফেলত। এখন তার বদলে আল্লাহ একটি উত্তম সন্তান দেবেন। আর সেই প্রাচীরের নিচে দুজন ইয়াতীমের সম্পদ আছে। প্রাচীর ভেঙে গেলে এলাকার দুষ্ট লোকেরা তা পেয়ে যাবে। এখন প্রাচীর মেরামত করে দেওয়ায় ইয়াতীমদ্বয় বড় হয়ে তাদের পাওনা খুঁজে নিতে পারবে। এসব জ্ঞান ওয়াহী বা ইলহামের মাধ্যমে আল্লাহ খাযিরকে দিয়েছেন। মূসা (আঃ) তখন বুঝতে পারেন আল্লাহ কাউকে না কাউকে মূসার চেয়েও বেশি জ্ঞান দিয়েছেন।

    তারপর সমগ্র বিশ্ব শাসনকারী মুসলিম বাদশাহ যুলকারনাইনের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি পশ্চিম দিক পর্যন্ত অনেক রাজ্য অধিকার করেন। সেখানকার কুফরিকারী ও ঈমানদার লোকদের সাথে যথাযথ আচরণ করেন। তারপর পূর্বদিকে অভিযাত্রা করে এমন এক জনপদে পৌঁছান, যাদের সূর্য থেকে আড়াল নিতে পারার কোনো উপায় নেই। তারপর আরেকদিকে অভিযাত্রা করেন। এমন জনপদের দেখা পান যারা ইয়াজুজ মাজুজের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। তাদের অনুরোধে তিনি কোনো ট্যাক্স ছাড়াই লোহা-তামার এক সুদৃঢ় প্রাচীর গড়ে দেন। অবশ্য সে জাতির লোকেরা শ্রম দিয়ে সহায়তা করে। ফলে ইয়াজুজ মাজুজের আক্রমণ বন্ধ হয়ে যায়। তবে যুলকারনাইন অহংকার না করে বলেন যে আল্লাহ যতদিন চাইবেন, ততদিনই এ প্রাচীর থাকবে। উল্লেখ্য কিয়ামাতের আগে ইয়াজুজ মাজুজ মুক্ত হয়ে হত্যাযজ্ঞ চালাবে।

    পূর্বেকার উম্মাতদের এসকল ঘটনা বর্ণনা করা আহলে কিতাবদের নিকট এটা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট যে মুহাম্মাদ (সাঃ) সত্য নবী, কারণ তারা ছাড়া অন্য কোনো আরব এসব জানত না। আখিরাতে অবিশ্বাসী কাফিররা ভাবে তারা অনেক ভালো কাজ করছে। কিন্তু তাদের কুফরের কারণে সেগুলো আখিরাতে ওজনই করা হবে না। আর ঈমানদার ও নেক আমলকারীরা জান্নাতে থাকবে।

    আল্লাহর যাত ও সিফাতের কথা লিখার জন্য যদি সকল সাগর কালি হয়ে যায়, তাতেও সব লেখা শেষ হবে না। মুহাম্মাদ (সাঃ) আমাদের মতোই মানুষ, পার্থক্য হলো তাঁর কাছে রবের নিকট হতে ওয়াহী আসে।

    ১৯। সূরা মারইয়াম

    সূরা মারইয়ামে পূর্বেকার কয়েকজন নবীর ঘটনা বর্ণিত হয়। মুসলিমদের নিকট এসব বিষয়ের জ্ঞান খ্রিষ্টানদের কাছে, বিশেষ করে হাবশার খ্রিষ্টানদের কাছে এগুলো প্রমাণ করে যে মুহাম্মাদ (সাঃ) সত্য নবী।

    যাকারিয়া (আঃ) অনেক বৃদ্ধ হয়ে যান। কিন্তু নিজ সন্তান না থাকায় ও চাচাত ভাইয়েরা অযোগ্য হওয়ায় তিনি আশংকা করেন তাঁর নবুওয়তি মিশন জারি রাখার মতো লোক থাকবে না। আল্লাহর কাছে দু’আ করলে আল্লাহ তাঁকে এ বয়সেও সন্তান দেন। তাঁর নাম ইয়াহইয়া (আঃ), যিনি ছিলেন জ্ঞানী, নিরহংকারী, পিতামাতার খেদমতকারী।

    মারইয়াম (আঃ) এর নিকট মানুষের রূপ ধরে এক ফেরেশতা আসলে তিনি তার থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান (তাঁর পবিত্র চরিত্রের একটি প্রমাণ)। ফেরেশতা নিজের পরিচয় দিয়ে সংবাদ দেন যে পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই মারইয়ামের গর্ভে ঈসা (আঃ) আসবেন। একদিন প্রসববেদনা উঠলে মারইয়াম (আঃ) লোকালয় থেকে দূরে চলে যান। সেখানে আল্লাহ তাঁর জন্য খাবার ও পানির ব্যবস্থা করেন। ঈসা (আঃ)-কে কোলে নিয়ে লোকালয়ে ফিরলে সকলে ছিঃছিঃ করতে থাকে। এ অবস্থায়ই ঈসা (আঃ) কথা বলে উঠে নিজের নবুওয়ত সম্পর্কে জানান। এতে সকলে বুঝতে পারে মারইয়াম (আঃ) ব্যভিচারিণী নন, আল্লাহর ইচ্ছায় অলৌকিকভাবে এই শিশুর জন্ম।

    ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার সাথে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় কথা বলে শির্কের বিরুদ্ধে দাওয়াহ দেন। তাঁর পিতা অনড় থাকে। ইবরাহীম তাঁর মূর্তিপূজক জাতি ও তাদের মিথ্যা উপাস্য থেকে নিজের বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করেন। এরপর ইসহাক, ইয়াকুব, ইসমাইল ও ইদরীস (আলাইহিমুসসালাম) এর মহান গুণাবলী বর্ণিত হয়। এঁদের বংশধররা ছিলেন ঈমানদার ও সৎ।

    এরপর এমন লোকেরা এলো যারা আল্লাহর অবাধ্যতা করল। আখিরাতে তাদের পরিণামের ভয়াবহ বর্ণনা দেওয়া হয়। মুমিন-কাফির নির্বিশেষে সকলের পুলসিরাত পার হওয়া ও ভিন্ন ভিন্ন পরিণতির কথা বর্ণিত হয়।

    কাফিররা মুমিনদের তুলনায় নিজেদের সম্পদের প্রাচুর্য দেখিয়ে গর্ব করে। আল্লাহ তাদের মনে করিয়ে দেন যে তাদের পূর্বের অনেক সীমালঙ্ঘনকারী জাতিকে তিনি ধ্বংস করেছেন যারা তাদের চেয়েও বেশি ধনী ছিল।

    আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেন- খ্রিষ্টানদের এরকম নোংরা বিশ্বাসকে কঠোর ভাষায় খণ্ডন করা হয়।

    অন্যান্য বান্দাদের মনে আল্লাহ সৎকর্মশীল ঈমানদারদের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।

    ২০। সূরা ত্বা-হা

    সূরা ত্বা-হা মূসা (আঃ) এর দীর্ঘ ঘটনা সম্বলিত। পরিবার নিয়ে মিশরের দিকে চলার পথে মূসা (আঃ) দূরে আগুন দেখতে পান। আলো ও পথনির্দেশনা পেতে তিনি সেদিকে যান। আসলে তা ছিলো আল্লাহর প্রেরিত নূর। তুওয়া উপত্যকায় তিনি মূসা (আঃ)-কে নবুওতের আলো আর হিদায়াতের পথনির্দেশ দেন। তাঁর লাঠিকে সাপে পরিণত করা ও সূর্যের মতো ঝলমলে হাতের মু’জিযা দেন। এরপর তাকে ফিরআউনের কাছে গিয়ে নম্র ভাষায় দাওয়াহ দিতে বলেন। তাঁর অনুরোধমতো তাঁর ভাই হারুন (আঃ)-কেও নবী বানিয়ে পাঠানো হয়। মূসা (আঃ)-কে শিশুকালে কীভাবে আল্লাহ বাঁচিয়েছেন, আল্লাহর ও তাঁর শত্রু ফিরআউনের ঘরে লালিত করেছেন, তাঁর নিজের মা-কেই দুধমা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তাঁর অন্তর জুড়িয়েছেন, পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন পরীক্ষা নিয়েছেন, এসব নিয়ামতের কথা আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন।

    ফিরআউনের দরবারে গিয়ে মূসা ও হারুন তাওহীদের দাওয়াত দেন। ফিরআউন কথা ঘুরানোর জন্য আগেকার জাতিদের কথা জিজ্ঞেস করেন। মূসা বলেন তাদের পরিণতি আল্লাহই জানেন, এভাবে তিনি প্রসঙ্গের ভেতর থাকেন। উজ্জ্বল হাতের মুজিযা দেখান। ফিরআউন এটাকে জাদু বলে আখ্যায়িত করে। কওমের এক উৎসবের দিনে মূসার সাথে সকল জাদুকরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আয়োজন করে। জাদুকরদের সে রাজকীয় পুরষ্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু জাদুকররা যখন তাদের দড়ি ইত্যাদি দিয়ে দেখানো ভেল্কিবাজি আর মূসা (আঃ) এর লাঠির সত্যিকার সাপ হওয়ার পার্থক্য বুঝতে পারে, তারা সবাই ঈমান এনে ফেলে। ফিরআউন রাগে অন্ধ হয়ে এটাকে মূসার ষড়যন্ত্র আখ্যায়িত করে। জাদুকরদের শূলে চড়ানোর হুমকি দেয়। ঈমান আনা জাদুকররা নির্ভীকভাবে প্রত্যুত্তর দেয়।

    বনী ইসরাইলকে ধাওয়া করতে গিয়ে ফিরআউন ও তার লস্কর লোহিত সাগরে ডুবে মরে। বনী ইসরাইল শাম ভূমিতে বসবাস শুরু করে।

    তাওরাত দানের জন্য মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ তূর পাহাড়ে ডেকে নেন। এও জানিয়ে দেন যে তাঁর অনুপস্থিতিতে সামিরি নামের এক লোক বনী ইসরাইলকে শির্কে লিপ্ত করেছে। মূসা (আঃ) রাগান্বিত হয়ে ফেরত এসে প্রথমে হারুনকে (আঃ) জেরা করেন। পরে বুঝতে পারেন যে বনী ইসরাইল তাঁর নির্দেশ অমান্য করে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়েছে।

    মূসা (আঃ) তাঁর কওমকে আবার সঠিক তাওহীদ শিক্ষা দেন। এরপর সামিরিকে ধরেন। সামিরি এমনকিছু দেখত যা অন্যরা দেখত না। জিবরীল (আঃ) এর ঘোড়া যেখানে পা ফেলত, সেখানকার মাটিতে সে প্রাণের লক্ষণ দেখত। স্বর্ণ দিয়ে বাছুর বানিয়ে সে তাতে ওই মাটির কিছু মিশিয়ে দেয়। ফলে বাছুরটি আওয়াজ করত। একেই বনী ইসরাইলের মাবুদ হিসেবে সে উপস্থাপন করেছিল। সে অভিশপ্ত হয়ে জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অস্পৃশ্য জীবনযাপন করে।

    এরপর কিয়ামাতের কিছু বর্ণনা দেওয়া হয়। পাহাড়গুলো বালুর মতো উড়ে যাবে, ভূমি একেবারে টানটান সমান করে ফেলা হবে। মানুষ ভাববে দুনিয়ার জীবন একদিনের মতো ছোট ছিলো।

    শয়তান কর্তৃক প্রতারিত হওয়ার পর আদম-হাওয়া আলাইহুমাসসালামের দুনিয়ায় আসার ঘটনা বর্ণিত হয়। আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তাঁদের কাছে হিদায়াত পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন। যারা এর অনুসরণ করবে, তারা জান্নাতি। যারা মুখ ফিরিয়ে নিবে, তারা জাহান্নামি। এই কুরআন সেই হিদায়াতের পূর্ণতা। পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়। কাফিরদের বিদ্রুপ ও প্রাচুর্যের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সালাত কায়েম করতে আদেশ করা হয়। নবী যখন এসেই গেছে, কাফিররা তো আর অজুহাত দিতে পারবে না যে তারা হিদায়াতের ব্যাপারে জানত না।

  • আজকের তারাবীহ: ১২ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ১২ রমাদ্বান

    ১৭। সূরা বনী ইসরাইল

    সূরা বনী ইসরাইলের শুরুতে ইসরা-মিরাজের ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহর ক্ষমতা এমনই যে তিনি তাঁর বান্দাকে এক রাতের কিছু অংশে এতদূর ভ্রমণ করান।

    বনী ইসরাইল তাদেরই বংশধর যারা নূহ (আঃ) এর সাথে নৌকায় ছিল। অথচ তারা নূহের মতো শোকরগুজার না হয়ে ফাসাদ সৃষ্টিকারী হয়েছে। এর ফলে তাদের ওপর দুইবার দুইজন প্রতাপশালী জালিম শাসক চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। শেষ নবীর (সাঃ) প্রতি ঈমান না এনে আবারও ফাসাদ করলে আবারও একই পরিণতি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।

    যেভাবে কল্যাণ চাওয়ার কথা, সেভাবে কাফিররা দ্রুত আযাব দেখতে চায় নিদর্শন হিসেবে। অথচ সৃষ্টিজগতেই হাজারো নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। দুনিয়ার রিযিক মুমিন-কাফির সকলের জন্য উন্মুক্ত, আর আখিরাত শুধু মুমিনদের জন্য। তাই দুনিয়াবি প্রাচুর্য থাকা মানেই হকপন্থী হওয়া নয়।

    পিতামাতা, আত্মীয়, মুসাফির, অভাবী, ইয়াতীমের হক আদায়, কৃপণতা ও অপচয়ের মাঝামাঝি পথ অবলম্বন, ব্যভিচারের নিকটে না যাওয়া, লোক না ঠকানো, অন্যায় হত্যা না করা, যাচাই না করে গুজব না ছড়ানো, অহংকার না করা, সর্বোপরি তাওহীদ আঁকড়ে ধরার হুকুম বর্ণিত হয়।

    একাধিক ইলাহ থাকলে তারা পরস্পর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে জগত বিশৃঙ্খল করে দিত।

    প্রথমবার যিনি সৃষ্টি করেছেন, দ্বিতীয়বার আখিরাতে সৃষ্টি করা তাঁর জন্য কঠিন কিছু নয়।

    উত্তম কথা বলার হুকুম করা হয়। শয়তান খারাপ কথার মাধ্যমে ঝগড়া বিবাদ লাগায়।

    মুশরিকরা কিছু জিন ও ফেরেশতাকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছিল। অথচ এসকল মাখলুক নিজেরাই আল্লাহর অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী।

    পূর্বেকার জাতিসমূহ স্পষ্ট মু’জিযা দেখেও কুফরি করে আযাব তরান্বিত করত। যেমন সামুদ জাতি পাহাড় থেকে বের হওয়া উটনী দেখেও সোজা হয়নি।

    আদম (আঃ) এর সৃষ্টি ও তাকে সেজদা করতে অবাধ্য ইবলীসের অহংকারের ঘটনা বিধৃত হয়। ফলে শয়তান অঙ্গীকার করে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার। তাকে কিয়ামাত পর্যন্ত আয়ু দিয়ে তার সকল বাহিনী নিয়ে চেষ্টা করার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের তিনি নিজেই রক্ষা করবেন।

    বিপদে পড়লে মানুষ সব উপাস্য ভুলে কীভাবে আল্লাহকে ডাকে, উদ্ধার পাওয়ার পর আবার কীভাবে শির্কে লিপ্ত হয়, তা নৌযানে সফরকালীন ঝড়ের উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হয়েছে।

    আখিরাতের বিচারে কারো প্রতি জুলুম করা হবে না।

    নানাবিধ প্ররোচনার পরেও রাসূল (সাঃ)কে পথচ্যুত করতে ব্যর্থ হয়ে পূর্ববর্তী নবীদের শত্রুদের মতোই মক্কার মুশরিকরাও ফিকিরে আছে রাসূলকে (সাঃ) এখান থেকে বের করে দেবে। অথচ এমনটা করার পর নবীর শত্রুরা নিজেরাও বেশিদিন নিজ জনপদে থাকতে পারে না। বাস্তবেও মক্কার মুশরিকদের এই পরিণতিই হয়েছিল।

    পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও তাহাজ্জুদের গুরুত্ব বর্ণিত হয়।

    সত্য সমাগত, মিথ্যা দূরীভূত। কুরআন মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও হিদায়াত। আর জালিমদের এর দ্বারা ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।

    রাসূলকে (সাঃ) রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। আল্লাহ জানিয়ে দেন রুহ হলো আল্লাহর হুকুম, যার বিস্তারিত জ্ঞান মানুষকে দেয়া হয়নি।

    মু’জিযা দেখতে চেয়ে কাফিররা যেসব আজগুবি দাবি করে সেগুলো খণ্ডন করা হয়েছে। নবী কেন ফেরেশতা না হয়ে মানুষ হলো এ নিয়েও তারা আপত্তি তোলে। এছাড়া এরা এত কৃপণ যে, আল্লাহর রহমতের ভাণ্ডার এদের হাতে থাকলেও তারা খরচ হয়ে যাওয়ার ভয়ে কৃপণতা করত। জাহান্নামে এদের জন্য নির্ধারিত আযাবের বর্ণনা দেয়া হয়।

    মূসা (আঃ) এর কওমের বিরুদ্ধে ফিরআউনের ষড়যন্ত্র ও এর পরিণতি বর্ণিত হয়।

    কুরআনকে অল্প অল্প করে নাযিল করার হেকমত বর্ণিত হয়।

    জ্ঞানীরা কুরআন শুনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে রবের প্রশংসা ঘোষণা করে ও বিনয়ী হয়।

    সালাতে মধ্যম স্বরে কুরআন তিলাওয়াত করতে বলা হয়। আল্লাহর আসমাউল হুসনা সম্পর্কে বলা হয়।

    ১৮। সূরা কাহফ, আয়াত ১ থেকে ৭৪

    সূরা কাহফে চারটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যা জীবনমরণ, সম্পদ, জ্ঞান ও ক্ষমতা সংক্রান্ত বিষয়ে আল্লাহর ওপর ঈমান রাখা বিষয়ক। উল্লেখ্য দাজ্জাল এসকল বিষয়েই ফিতনা ছড়াবে।

    প্রথম ঘটনাটি গুহাবাসী যুবকদের বা আসহাবুল কাহফের। তারা ছিল বিশুদ্ধ তাওহীদবাদী। কিন্তু তারা যে রাজ্যে থাকত, তার বাদশাহ ও জনগণ ছিল মুশরিক। তাদের পক্ষ থেকে অত্যাচার ও কুফরের দাওয়াতের ভয় ছিল। যুবকেরা এই সমাজের সাথে কোনো আপোষ না করে একটি গুহায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। তাদের সাথে তাদের এক কুকুর ছিল। সেই গুহার ভেতর আল্লাহ তাদের ঘুম পাড়িয়ে দেন আর কুকুরটি পাহারার ভঙ্গিতে গুহামুখে বসে থাকে। এ অবস্থায় ৩০০ বা তারও বেশি বছর (প্রকৃত সময়সীমা আল্লাহই জানেন) পেরিয়ে যায়। এরপর তারা জেগে উঠে অনুমান করার চেষ্টা করে তারা কতদিন ঘুমিয়ে ছিল। তাদের মধ্যকার একজনকে কিছু টাকা দিয়ে তারা সাবধানে কোথাও থেকে হালাল খাবার আনতে পাঠায়। ততদিনে সেই এলাকায় তাওহীদপন্থী সাচ্চা ঈমানদার বাদশাহ ও জনপদ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এবং তারা বহু বছর আগে এই যুবকদের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা জানত। খাবার কিনতে আসা যুবকের কাছে শতশত বছর আগের মুদ্রা দেখে সব কাহিনী খোলাসা হয়ে যায়। এতে ঐসকল যুবক ও জনপদের লোকেদের উভয় পক্ষের ঈমান বেড়ে যায়। এর অল্পসময় পরেই যুবকেরা মারা যায় এবং জনপদের লোকেরা তাদের অত্যন্ত সম্মান দেখায়। জীবন দিয়ে হলেও কুফরের সাথে আপোষ না করা এবং আখিরাতের পুনরুত্থানের একটি নমুনা এখান থেকে জানা যায়। কিন্তু যাদের মূল শিক্ষার দিকে ঝোঁক নেই, তারা যুবকদের সংখ্যা, কুকুরের গায়ের রং, গুহায় অবস্থানকাল  ইত্যাদি নিয়ে গবেষণায় লিপ্ত হবে।

    কাফিররা মুহাম্মাদ (সাঃ) এর অনুসারীদের মাঝে গরীব লোকদের দেখে বলত এদেরকে সরিয়ে তাদের মতো সম্ভ্রান্তদের জায়গা করে দিতে। তাহলে তারা ঈমান আনবে। আল্লাহ দুই ব্যক্তির ঘটনার উপমা দেন। একজনের দুটি উর্বর বাগান ছিল। সে নিজ সম্পদ নিয়ে অহংকার করত, আখিরাত অস্বীকার করত। অপরজন তাকে অহংকার ত্যাগ করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে বলে, অন্যথায় কোনো আযাব চলে আসতে পারে। এমতাবস্থায় একদিন কোনো এক দুর্যোগ এসে ওই অহংকারীর সব ফসল নষ্ট করে ফেলে। মুমিন-কাফির উভয়ই দুনিয়ায় কিছু না কিছু রিযক পায়। কিন্তু আখিরাতে কাফিরের সব উপার্জন এভাবে নিষ্ফল হয়ে যাবে। নিজ আমলনামা দেখে গুনাহহাররা ভাববে হায় এ কেমন আমলনামা! এ যে ছোট বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি। আদমকে সিজদা না করা জ্বীন ইবলিসের অনুসারী এবং মুশরিকদের জন্য আছে শুধুই আগুন।

    রাসূলদের আনিত বিধানের বিপক্ষে কাফিররা বাতিল দ্বারা তর্ক করে। আল্লাহর আয়াত স্মরণ করিয়ে দেয়ার পরও তা থেকে যারা বিমুখ হয় তারাই সর্বাধিক জালিম। প্রতিশ্রুত সময়ে তারা অবশ্যই আযাবপ্রাপ্ত হবে। মূসা (আঃ)-কে একবার এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেছিল সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি কে। সংশ্লিষ্ট যুগের নবীর চেয়ে যেহেতু কারো জ্ঞান বেশি হয় না, তাই সেটা ভেবে মূসা (আঃ) অহংকার ছাড়াই জবাব দেন যে তিনিই সবচেয়ে জ্ঞানী। এ উত্তর আল্লাহর পছন্দ না হওয়ায় তিনি মূসা (আঃ)-কে তাঁর আরেক জ্ঞানী বান্দা খাযির (আঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করাতে চান। মূসা (আঃ) জ্ঞান লাভের আগ্রহে সেদিকে যাত্রা করেন। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন ইউশা (আঃ)। কথা ছিল তাঁদের সঙ্গে থাকা মাছ যেখানে হারিয়ে যাবে, সেখানেই খাযির (আঃ) এর দেখা পাওয়া যাবে। এক জায়গায় তাঁরা বিশ্রাম নিতে গেলে মাছটি সমুদ্রে সুড়ঙ্গ মতো পথ করে চলে যায়। ইউশা (আঃ) এ কথা মূসা (আঃ)-কে বলতে ভুলে যান। সামনে কিছুদূর পথ চলার পর মূসার (আঃ) ক্ষিদে পায়। সেসময় ইউশা (আঃ) এর সেই মাছের কাণ্ড মনে পড়ে। মূসা (আঃ) বুঝতে পারেন কাঙ্ক্ষিত জায়গা তাঁরা ফেলে এসেছেন। সেখানে ফিরে গিয়ে তাঁরা খাযির (আঃ) এর দেখা পান। মূসা (আঃ) জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে তাঁর সঙ্গী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। খাযির (আঃ) বললেন যে মূসা (আঃ) তাঁর সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না। মূসা (আঃ) ধৈর্য ধরার প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁরা একসাথে চলতে শুরু করেন। তাঁরা একটি নৌকায় কিছু পথ যান। খাযির (আঃ) নৌকাটি ফুটো করে দেন। কিছুদূর গিয়ে তিনি একটি বালককে হত্যা করেন। উভয় ঘটনায়ই মূসা (আঃ) ধৈর্য হারিয়ে প্রশ্ন করে বসেন। ঘটনার বাকি অংশ পরের তারাবীহতে আসছে ইনশাআল্লাহ।

  • আজকের তারাবীহ: ১১ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ১১ রমাদ্বান

    ১৫। সূরা হিজর, আয়াত ২ থেকে ৯৯

    কিয়ামাতের দিন কাফিররা আফসোস করবে তারা যদি ঈমানদার হয়ে যেত। দাওয়াহ দেওয়ার পরও দুনিয়ায় তারা ভ্রান্তিতে পড়ে থাকতে চাইলে তাদের সেভাবেই ছেড়ে দিতে বলা হয়।

    কাফিররা রাসূলকে (সাঃ) উন্মাদ বলত। আল্লাহ জানিয়ে দেন যে পূর্ববর্তী নবীদেরও এসব বলা হত। কাফিরদের জন্য আসমানের দরজা খুলে দিয়ে তাতে চড়ার অনুমতি দিলেও তারা সেটাকে জাদু বলে অস্বীকার করে বেঈমানই থাকত।

    আসমান-জমিনে আল্লাহ সকল মাখলুকের জন্য যে বিপুল রিযক ছড়িয়ে রেখেছেন, তা স্মরণ করানো হয়।

    ঠনঠনে মাটি থেকে আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি থেকে শুরু করে ইবলীসের অহংকার করে বিতাড়িত হওয়া পর্যন্ত ঘটনা বর্ণিত হয়। ইবলীস সকল মানুষকে পথভ্রষ্ট করার হুমকি দেয়। কিন্তু আল্লাহর প্রকৃত বান্দাদেরকে যে সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে টলাতে পারবে না, তা নিজেই স্বীকার করে।

    শয়তানের অনুসারীদের একেকদল জাহান্নামের সাত দরজার একেকটি দিয়ে ঢুকবে। আর মুত্তাকীরা জান্নাতে থাকবে যেখানে তাদের মনের দুঃখকষ্ট সব দূর করে দেওয়া হবে, সকলে মিলেমিশে থাকবে।

    ইবরাহীম (আঃ) এর ঔরসে বৃদ্ধ বয়সে ইসহাক (আঃ) এর জন্মের সুসংবাদ আনয়নকারী ফেরেশতাদের ঘটনা বর্ণিত হয়। সেখান থেকে এই ফেরেশতারা লূত (আঃ) এর কওমের নিকট আযাব নিয়ে যান। এছাড়া শুআইব (আঃ) এর কওমও আযাবে ধ্বংস হয়। উভয় কওমের বাসস্থানই (সাদ্দুম ও মাদায়েন) মানুষের চলাচলের পথের পাশে। মানুষ যেন এসব দেখে শিক্ষা নেয় যে আল্লাহর অবাধ্যতার পরিণাম কী হয়। আর সামূদ জাতির বাসস্থান ছিল হিজর, যেখানে তারা পাহাড় কেটে সুদৃঢ় বসতি বানিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে আল্লাহর নাফরমানি করত। আযাবে ধ্বংস হওয়ার সময় এসব ঘরবাড়ি তাদের কোনো কাজে আসেনি।

    কাফিরদের দুনিয়ার ভোগবিলাসের উপকরণকে পরোয়া না করতে, মুমিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে, প্রকাশ্যে দাওয়াহ দিতে, মুশরিকদের পরোয়া না করতে, বিপদ ও মানসিক অশান্তির সময় আল্লাহর হামদ ও তাসবীহ পাঠ করতে এবং সালাত আদায় করতে এবং মৃত্যু পর্যন্ত ইবাদাত করে যেতে বলা হয়।

    ১৬। সূরা নাহল

    মুসলিমদের বিজয় ও কাফিরদের পরাজয়ের ভবিষ্যৎবাণী শুনে কাফিররা ঠাট্টা করত। সূরা নাহলের শুরুতে সে অবশ্যম্ভাবী ভবিষৎবাণী শক্তভাবে পুনঃব্যক্ত করা হয়েছে। সামান্য শুক্রবিন্দু হতে সৃষ্ট মানুষ কীভাবে একসময় প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী হয়ে যায়, তার তিরস্কার করা হয়েছে।

    মানুষের প্রতি আল্লাহর বিবিধ নিয়ামাতের কথা স্মরণ করানো হয়েছে ও তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে বলা হয়েছে। পালিত পশু, বৃষ্টি, উদ্ভিদ, ফসল, রাতদিনের আবর্তন, চাঁদ, সূর্য, নক্ষত্র দ্বারা পথ চেনা, সমুদ্র তলের খাদ্য ও ধনভাণ্ডার, নৌযান ইত্যাদি নিয়ামাত গুনে শেষ করা যাবে না। সবই আল্লাহর দান, মিথ্যা উপাস্যরা এর কিছুই সৃষ্টি করেনি।

    কাফির নেতা ও অনুসারীদের আখিরাতের পরিণতির কথা বলা হয়েছে। পূর্ববর্তী জাতিসমূহের কাফিররাও একইরকম অবাধ্যতা করত, ফলে অপ্রস্তুত অবস্থায় তাদের ওপর আযাব চলে আসত।

    জান কবজ করার সময় কাফির ও মুত্তাকীদের অবস্থার পার্থক্য বর্ণিত হয়েছে। উল্লেখ্য, এসব জায়গায় কাফিরদের অহংকারী বৈশিষ্ট্যের কথা বারবার উল্লেখিত হয়েছে।

    জমিনে বিচরণ করে দেখতে বলা হয় নবীদের অস্বীকারকারী জাতিসমূহের কী অবস্থা হয়েছিল। তাদের কাছে মানুষদেরকেই নবী করে পাঠানো হতো।

    কাফিররা আখিরাতের অস্তিত্ব অসম্ভব মনে করে। অথচ আল্লাহ কোনোকিছু হওয়ার হুকুম করলেই তা হয়ে যায়।

    আল্লাহর আযাব অকস্মাৎও আসতে পারে, ক্রমশও আসতে পারে।

    আল্লাহর রাস্তায় কাজ করতে গিয়ে নিপীড়িত হয়ে নিজ ভিটেমাটি থেকে হিজরত করা লোকদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম রিযকের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

    সকল প্রাণী ও ফেরেশতা আল্লাহকেই সিজদাহ করে। সকল নিয়ামাত আল্লাহর দেওয়া। বিপদে পড়লেও মানুষ তাঁকেই ডাকে। আল্লাহ বিপদ দূর করে দিলে এরাই আবার শির্ক করে।

    কাফিররা কিছু ফেরেশতা ও দেবীদের আল্লাহর কন্যা বলত। অথচ নিজেদের কন্যাসন্তান হলে কোথায় মুখ লুকাবে, নাকি একে মাটিতেই পুঁতে ফেলবে এ নিয়ে অস্থির হয়ে পড়ত।

    মৃতভূমিতে বৃষ্টির মাধ্যমে প্রাণসঞ্চারের মাঝে আখিরাত অস্বীকারকারীদের জন্য চিন্তার খোরাক দেওয়া হয়।

    আল্লাহর দেওয়া গবাদি পশু, ফল ও মৌমাছি থেকে প্রাপ্ত পানীয় এবং স্ত্রী-সন্তানের নিয়ামাত স্মরণ করানো হয়।

    মানুষ নিজেরাই নিজেদের দাসদাসীদের এমনভাবে দান করে না যাতে দাস-মনিব সমান হয়ে যায়। অথচ আল্লাহর দাসদের ঠিকই আল্লাহর সাথে শরীক করে।

    মুশরিকরা কুযুক্তি দিত যে দুনিয়ার কোনো বাদশাহ একা একা রাজ্য চালায় না, আল্লাহও বিভিন্ন দায়িত্ব সেরকমভাবে দেবদেবীদের হাতে ন্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টির সক্ষমতার মাঝে পার্থক্য দেখিয়ে প্রমাণ করে দেন যে সৃষ্টিকূলের মাঝেই এত পার্থক্য থাকলে স্রষ্টার (আল্লাহ) সাথে সৃষ্টির (দুনিয়ার বাদশাহ) তুলনা নিতান্ত বোকামি।

    ভাসমান পাখি, মানুষের স্থায়ী ঘর, পশুর চামড়া থেকে তৈরি অস্থায়ী ঘর, অন্যান্য অঙ্গ থেকে পাওয়া তৈজসপত্র, গাছ-পাহাড়ের ছায়া, খনিজ থেকে বানানো বর্ম ইত্যাদি নিয়ামাত স্মরণ করানো হয়।

    কিয়ামাতের দিন নবীগণ তাঁদের উম্মাহর কাফিরদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন। কাফিররা সেদিন তাদের মিথ্যা উপাস্যদের গালাগাল করতে থাকবে।

    মুমিনদের জীবনে অবশ্য অনুসরণীয় কিছু গুণাবলীর কথা বলা হয়। ন্যায়বিচার ও দয়া করা, আত্মীয়ের হক প্রদান, অশ্লীলতা ও জুলুম না করা, অঙ্গীকার পূর্ণ করা। অঙ্গীকার ভঙ্গ না করার জন্য চমৎকারভাবে নসীহত করা হয়।

    কুরআন পড়ার সময় আ’উযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রজীম পড়ার হুকুম করা হয়।

    কোনো আয়াত বা বিধান রহিত করে নতুন আয়াত বা বিধান আনয়নের হিকমত বর্ণিত হয়েছে।

    মুশরিকরা অপবাদ দিত যে রাসূল (সাঃ)-কে অমুক ব্যক্তি কুরআন শিখিয়ে দেয়। অথচ ওই ব্যক্তি নিজেই এক আরবি না জানা অনারব।

    স্বেচ্ছায় কুফরিকারীদের আযাবের কথা বলা হয়েছে। যাদেরকে নিপীড়ন করে মুখে কুফরি কথা বলতে বাধ্য করা হয়েছে, তাদের কথা আলাদা। নিপীড়িত হওয়ার পর হিজরত ও জিহাদ করা ব্যক্তিদের মাগফিরাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।

    আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মনগড়া হালাল-হারামের বিধান নাকচ করে প্রকৃত হালাল-হারামের বিধান এবং অপারগ অবস্থার বিধান বর্ণিত হয়েছে।

    আহলে কিতাব ও আরব মুশরিক- সকলের সম্মানের পাত্র ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন বিশুদ্ধ তাওহীদবাদী। উত্তম পন্থায় দাওয়াহ প্রদানের নিয়ম বর্ণিত হয়। জুলুমের সমপরিমাণ প্রতিশোধ নেওয়া বা ক্ষমা করার বিধান ও ফজিলত বর্ণিত হয়।

  • আজকের তারাবীহ: ১০ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ১০ রমাদ্বান

    ১২। সূরা ইউসুফ, আয়াত ৫৩ থেকে ১১১

    ইউসুফ (আঃ) সাক্ষ্য দেন যে দুর্বল মুহূর্তে আল্লাহই তাঁকে খারাপ কাজে প্রলুব্ধ হওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন, তাঁর নিজের কৃতিত্ব নেই।

    মিসরের বাদশাহ ইউসুফ (আঃ)-কে অর্থমন্ত্রী তথা ‘আযীযে’র পদে ভূষিত করেন। এভাবে এক কালে সব হারানো ইউসুফকে আল্লাহ মহাসম্মানের স্থানে তুলে নেন।

    দুর্ভিক্ষ শুরু হলে রেশনের জন্য ইউসুফের ভাইয়েরা এলো। ইউসুফ তাদের চিনলেন, তারা তাঁকে চিনতে পারেনি। তাদের প্রত্যেককে উট বোঝাই মালসামানা দেওয়া হলো। পিতার দেখভালের জন্য ঘরে থাকা বিন ইয়ামীনের জন্যও তারা সামানা চাইল। ইউসুফ (আঃ) বললেন ভাইকে সাথে করে আবার আসতে। নাহয় পরবর্তীবার তাদের কিছু দেওয়া হবে না।

    ভাইয়েরা হতাশ হয়ে ফিরে গিয়ে ইয়াকুবকে (আঃ) বললো বিন ইয়ামীনকেও তাদের সাথে পাঠাতে। কিন্তু ইউসুফের সাথে ইতোপূর্বে তারা যা করেছে সেজন্য ইয়াকুব (আঃ) ভরসা পেলেন না। ভাইয়েরা তাদের মালপত্রে হাত দিয়ে দেখল রেশন আনার জন্য তারা যেসব পণ্য নিয়ে গিয়েছিল (তখন পণ্য বিনিময় প্রথা ছিল), তা তাদের অজান্তে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে পরেরবার আবার সেগুলো নিয়ে যেতে পারে। তা দেখিয়ে তারা পিতাকে ভরসা দিল। কথা দিল এইবার নিরাপত্তার কোনো ব্যত্যয় করবে না। ইয়াকুব (আঃ) অনুমতি দিলেন। তাদের বললেন শহরের আলাদা আলাদা ফটক দিয়ে ঢুকতে। কারণ এগার ভাইয়ের দলকে দেখলে কারো বদনজর লাগতে পারে। তবে এ-ও বলে দেন যে, বদনজর থেকে বাঁচানোর মালিক তো কেবল আল্লাহই।

    বিন ইয়ামীন সহ তারা মিশরে গেলে ইউসুফ (আঃ) তাঁর ভাইকে নিজের কাছে রাখার ইচ্ছা করলেন। একটি রাজকীয় পানপাত্র গোপনে তিনি বিন ইয়ামীনের সামানার সাথে রেখে দিলেন। পানপাত্র হারানোর খবর চাউর হওয়ার পর লোকেরা ইউসুফের ভাইদের চোর সাব্যস্ত করল। তারা অস্বীকার করল। জিজ্ঞেস করা হলো তাদের কাছে চুরির মাল পাওয়া গেলে কী করা হবে। তারা ইয়াকুব (আঃ) এর শরিয়ত অনুযায়ী বলল যে শুধু চোরকে পণ্যের মালিক বন্দী করে রাখবে, বাকিদের ছেড়ে দিবে (মিশরের রাজার আইন/শরিয়ত অনুযায়ী এত সহজে ইউসুফ ভাইকে নিজের কাছে রাখতে পারতেন না)। তল্লাশীর পর বিন ইয়ামীনের সামানার ভেতর পানপাত্রটি পাওয়া গেল। অন্য ভাইয়েরা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বলল, তার ভাইও (ইউসুফ) তো এরকম একবার চুরি করেছিল। ইউসুফ (আঃ) তাদের কিছু বললেন না।

    পিতার কাছে এত কঠিন প্রতিজ্ঞা করার পর বিন ইয়ামীনকে ছাড়া ফিরতে সংকোচ লাগায় ভাইদের মাঝে সবার বড়জন মিশরে থেকে যায়। বাকিরা গিয়ে ইয়াকুব (আঃ)-কে সব ঘটনা জানায়। ইয়াকুব (আঃ) কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে যান। অতঃপর ছেলেদের বলেন ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সন্ধান করতে, আশা না হারাতে। আল্লাহর রহমত থেকে কাফিররাই কেবল হতাশ হয়।

    ভাইয়েরা আবার মিশরে ফিরে গিয়ে মালসামানার জন্য অনুনয় করে। ইউসুফ (আঃ) তাদের সামনে নিজ পরিচয় প্রকাশ করেন। ভাইয়েরা অনুতপ্ত হয়। তিনি তাদের সকলকে ক্ষমা করে দেন। তিনি ভাইদের বলেন পিতামাতাকে সহ মিশরে নিয়ে আসতে। সাথে তিনি নিজের একটি জামা দেন, যা ইয়াকুব (আঃ) এর চোখে রাখলে আল্লাহর ইচ্ছায় মু’জিযাস্বরূপ চোখ ভালো হয়ে যাবে।

    তারপর পিতামাতাকে সহ ভাইয়েরা সবাই ইউসুফ (আঃ) এর কাছে ফিরে আসে। ইউসুফ পিতামাতাকে সম্মানের আসনে বসান। তারা সকলে ইউসুফ (আঃ) এর সামনে সেজদা করেন, কারণ পূর্ববর্তী নবীদের শরিয়তে এমন সম্মানসূচক সেজদা জায়েয ছিল। এভাবে সূরার শুরুতে ইউসুফ (আঃ) এর দেখা স্বপ্ন সত্যি হয়। ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানান।

    পরিশেষে আল্লাহ মুহাম্মাদ (সাঃ) ও মুমিনদের সান্ত্বনা দেন। ইউসুফ (আঃ) এর মতোই দীর্ঘ সময়ে দুঃখকষ্টে থাকা লাগলেও মুমিনরা শেষমেশ জয়ীই হবে । কাফিররা যে আল্লাহর ওপর ঈমান আনার পাশাপাশি শির্কও করে, তার তিরস্কার করা হয়। প্রতি যুগেই এমন হয়েছে যে নবীর শত্রুরা আযাব আসতে দেরি দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে। কিন্তু ঠিকই শেষ পর্যন্ত তারা ধ্বংস হয়েছে।

    ১৩। সূরা রা’দ

    সূরা রা’দে আল্লাহর বিভিন্ন সৃষ্টির প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাওহীদের প্রমাণ দেখানো হয়েছে। খুঁটিবিহীন আসমান, চাঁদ, সূর্যের আবর্তন, বিস্তীর্ণ পৃথিবী, নদনদী, জোড়ায় জোড়ায় মাখলুক, পাশাপাশি অবস্থিত বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ড, উদ্ভিদবৈচিত্র্য সৃষ্টিকারীর জন্য আখিরাতে পুনরায় সৃষ্টি কঠিন কিছু নয়।

    মাতৃগর্ভে যা বাড়েকমে, দিনেরাতে যে যা প্রকাশ্যে ও গোপনে বলে- সবই আল্লাহর জ্ঞানের আয়ত্তাধীন।

    আল্লাহ বিজলি চমক দিয়ে আশা ও ভীতি উভয়ই প্রদর্শন করেন। বজ্রনির্ঘোষ ও ফেরেশতাগণ তাঁরই প্রশংসা করে।

    আল্লাহ ছাড়া অন্য সৃষ্টির কাছে দু’আ করাটা যেন পানির নিকট দু’আ করার মতো, যাতে তা আপনাআপনিই মুখে চলে আসে। (এদিক দিয়ে মুশরিকদের মূর্তিপূজা ও নাস্তিকদের বস্তুপূজা একইরকম)

    সকল কিছুই স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে আল্লাহর আনুগত্য করে।

    বাতিল মতাদর্শ ফেনার মতো উপচে পড়া অস্থায়ী জিনিস। আর হক হলো জমিনে থেকে যাওয়া উপকারী ও স্থায়ী বস্তু।

    আখিরাতে কাফিররা দুনিয়ার সমস্ত সম্পদের কয়েকগুণ মুক্তিপণ দিয়ে হলেও শাস্তি থেকে বাঁচতে চাইবে, কিন্তু তা সম্ভব হবে না।

    মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো অঙ্গীকার ও চুক্তি রক্ষা করা, আল্লাহর নির্দেশিত সম্পর্কগুলো রক্ষা করা, সবর করা, সালাত কায়েম, আল্লাহর দেওয়া রিযক থেকে গোপন ও প্রকাশ্যে দান, দুর্ব্যবহারের বিপরীতে সদাচরণ করা। এরা আত্মীয়পরিজন সহ জান্নাতে যাবে। এর বিপরীতকারীরা জাহান্নামি।

    আল্লাহর স্মরণেই (যিকর) অন্তরসমূহ প্রশান্তি পায়।

    কাফিররা মু’জিযা দেখলে ঈমান আনবে বলে যে মিথ্যা দাবি করে, তার অসারতা দেখান হয়। মুমিনরাও ভাবত এসকল কাফিরের ওপর আযাব আসছে না কেন। বলা হয়, দুনিয়ায় তো এদের উপর ছোটখাটো বিপদ আসছেই, আর আখিরাতের শাস্তি তো আরো কঠিন। শির্ক কুফরের প্রতিপত্তি চারদিক থেকে সংকুচিত হয়ে আসছে।

    মুশরিকরা মাটির মূর্তি বানিয়ে কল্পিত নাম আরোপ করে তার পূজা করে। আহলে কিতাবরা আল্লাহর কিতাবের কিছু অংশ মানতে অস্বীকার করে। এ সকল প্রকার শির্ককে তিরস্কার করা হয়েছে।

    ১৪। সূরা ইবরাহীম

    সূরা ইবরাহীমেও ইসলামের মৌলিক আকিদা বিশ্বাস আলোচিত হয়েছে। আখিরাতের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্যদানকারী ও দ্বীনের মাঝে বক্রতা অনুসন্ধানকারীদের তিরস্কার করা হয়েছে।

    নূহের (আঃ) জাতি, আদ, সামূদ, ফিরআউনের অবাধ্যতা ও পরিণতির কথা স্মরণ করানো হয়েছে। তাদের কাছে প্রেরিত নবীগণও মানুষই ছিলেন। কাফিররা দুনিয়াতেও ধ্বংস হয়, ফলে ঈমানদাররা জমিনে প্রতিষ্ঠা পায়। জাহান্নামে কাফিরদের গলিত পুঁজ ভক্ষণ করানো হবে, পোশাক হবে আলকাতরার, মুখ আগুনে আচ্ছন্ন হবে। মৃত্যু তাদের চারদিক থেকে এগিয়ে আসবে, কিন্তু তারা মরবে না। তাদের দুনিয়ার সব ভালো কাজ ছাইয়ের মতো- যা ঝড়ে উড়ে গেছে, কোনো লাভ হয়নি।

    কাফিররা তাদের নেতাদেরকে আখিরাতে বলবে তাদের জন্য কিছু করতে। নেতারা অপারগতা প্রকাশ করবে। তাদেরকে সুন্দর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভুলিয়ে রাখা শয়তানও সেদিন তাদের থেকে দায়মুক্তি ঘোষণা করবে। সে তো কেবল ভ্রান্ত পথের দিকে ডেকেছিল, কাউকে জোর করেনি। আজ সেও কাউকে শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারবে না, তাকেও কেউ বাঁচাবে না।

    পবিত্র বাক্য বা কালিমা তাইয়্যিবাহ হলো পবিত্র গাছের মতো, যার মূল দৃঢ়ভাবে প্রোথিত, ডালপালা আসমানে উত্থিত, প্রতিপালকের নির্দেশে অহরহ ফল দেয়। আর অপবিত্র বাক্য বা কুফরি কথাবার্তা হলো অপবিত্র গাছের মতো, যাকে উপড়ে ফেলা হয়েছে।

    সূর্য-চন্দ্র, নদী-নালা, যানবাহনকে আল্লাহ আমাদের অধীন করে দিয়েছেন যেন আমরা তাঁরই ইবাদাত করি।

    ইবরাহীম (আঃ) এর বংশধর হিসেবে আরবরা গর্ব করত। অথচ তিনি শির্ক ও মূর্তিপূজা ঘৃণা করতেন, সন্তানরাও যাতে এ থেকে বেঁচে থাকে সেই দু’আ করেছেন। হাজেরা (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ)-কে তিনি আল্লাহর আদেশে এই ভূমিতে রেখে গেছেন যেন তারা সালাত কায়েম করে। তাই আল্লাহ এই বিরানভূমিতে তাঁদেরকে উত্তম রিযক দিয়েছেন। ইবরাহীম (আঃ) সকল মুমিনের মাগফিরাতের দু’আ করেন।

    কিয়ামতের দিন কাফিররা আরেকটু অবকাশ চাইবে কিন্তু তাদের তা দেওয়া হবে না।

    ১৫। সূরা হিজর, আয়াত ১

  • আজকের তারাবীহ: ৯ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ৯ রমাদ্বান

    ১১। সূরা হুদ, আয়াত ৬ থেকে ১২৩

    সকল মাখলুকের রিযিক আল্লাহ দিয়ে থাকেন। দুনিয়ার জীবনকে পরীক্ষা হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। আখিরাত নিয়ে ঠাট্টাকারীদের ওপর আচমকা আযাব চলে এলে তারা বিপদে পড়বে।

    আল্লাহ মানুষকে বিপদ দিলে তারা হতাশ হয়ে পড়ে, আবার নিয়ামাত দিলে অহংকার করে। যারা এমনটা না করে ধৈর্য ধরে ও নেক আমল করে, তারাই আল্লাহর কাছে প্রতিদানের যোগ্য।

    মুশরিকরা রাসূল (সাঃ)-কে কখনও বলত মূর্তির সমালোচনা বাদ দিয়ে বাকি কুরআন পড়তে, কখনো বলত তাঁর সাথে সাথে ফেরেশতা ঘোরাফেরা করে না কেন। কখনো বলত এটা তাঁর (সাঃ) নিজের রচনা। তাদেরকে সকলে মিলে কুরআনের অনুরূপ দশটি সূরা তৈরি করে আনতে বলা হয় (পরবর্তীতে নাযিলকৃত আয়াত ২:২৩ ও ১০:৩৮ এ সহজ করে একটি সূরা বানাতে বলা হয়)। এখানে উল্লেখ্য, সমসাময়িক সাহিত্যে পারদর্শী আরব মুশরিকরা এরকম গূঢ়ার্থপূর্ণ ও সাহিত্যমানের জিনিস তৈরির চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সাহস করেনি। বর্তমানে অনুবাদ পড়া ইসলামবিদ্বেষীরা অর্থহীন ও সাহিত্যমাধুর্যহীন লাইন তৈরি করে দাবি করে তারা চ্যালেঞ্জে জিতে গেছে।

    আখিরাত অবিশ্বাসীরা তাদের সব ভালো কাজের প্রতিদান দুনিয়ায়ই পেয়ে যাবে। আখিরাতে তাদের মিথ্যা উপাস্যরা তাদের বাঁচাতে আসবে না। আর মুমিনগণ থাকবেন জান্নাতে। উভয় দলের উপমা যথাক্রমে অন্ধ-বধির এবং দৃষ্টিমান-শ্রুতিবানের মতো।

    তারপর বিভিন্ন নবীর ঘটনা বর্ণনা শুরু হয়। একজন নিরক্ষর আরবের মুখে আসমানী কিতাবের এসকল ঘটনার নির্ভুল বর্ণনাও তাঁর নবুওয়াতের প্রমাণ।

    নূহ (আঃ) তাওহীদের দাওয়াত দিলে কাফির নেতারা তাঁকে অমান্য করে। মক্কার মুশরিকরা যেসব প্রশ্ন তুলত, সেসব প্রশ্ন তারাও করে। তাদের সকলেরই প্রশ্ন ছিল নবীকে সমাজের দুর্বল লোকেরাই কেবল অনুসরণ করে কেন আর নবীর সাথে আসমান জমিনের ধনভাণ্ডার থাকে না কেন। নূহ (আঃ) জবাব দেন দুনিয়াবি দৃষ্টিতে দুর্বল এসব লোকের মাঝে আল্লাহ ভালো কিছু দেখলে আমরা আপত্তি করার কে? আর নবী অর্থ এই না যে তিনি কোনো সুপারপাওয়ারধারী ফেরেশতা হবেন, নবী তো কেবল আল্লাহর বার্তাবাহক। তিনি এ কাজের জন্য কোনো পার্থিব পারিশ্রমিকও দাবি করেন না। আল্লাহর নির্দেশে নূহ (আঃ) নৌকা তৈরি করতে শুরু করলে কাফিররা উপহাস শুরু করে। অবশেষে প্রতিশ্রুত আযাব চলে আসে। নৌকায় আরোহণ করা মুমিন এবং অন্যান্য জোড়া জোড়া জীব ছাড়া সবাই ধ্বংস হয়। নূহ (আঃ) এর এক ছেলেও নৌকায় উঠতে অস্বীকার করে মারা যায়। আল্লাহ ওয়াদা করেছিলেন নূহের পরিবারকে তিনি বাঁচাবেন। নূহ (আঃ) এই দুটি ঘটনার সামঞ্জস্য ধরতে পারছিলেন না। আল্লাহ জানিয়ে দিলেন সেই ছেলে নূহের পরিবারের কেউ নয়, কারণ সে কুফরি করেছে।

    আদ জাতির কাছে সেই জাতিরই একজন হুদ (আঃ)-কে নবী করে পাঠানো হয়। হুদ (আঃ) তাওহীদে বিশ্বাস ও অহংকার ত্যাগ করার দাওয়াত দেন। তাহলে আল্লাহ তাদের প্রতিপত্তি আরো বাড়িয়ে দেবেন। এখানেও কাফির নেতাদের সাথে হুদ (আঃ) এর বাদানুবাদ হয়। কাফিররা বলে তাদের কোনো উপাস্যের অভিশাপেই হুদ (আঃ) এমন হয়ে গেছেন (না’উযুবিল্লাহ)। অতঃপর আযাবের নির্ধারিত দিন এলে মুমিনগণ ছাড়া আদ জাতি সমূলে ধ্বংস হয়।

    সামূদ জাতির কাছে সেই জাতিরই সালিহ (আঃ) কে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়। তাঁর দাওয়াত শুনে কাফিররা বলে, তোমাকে নিয়ে আমাদের বড় আশা ছিল অথচ তুমি আমাদেরকে বলছ বাপদাদাদের উপাস্যগুলো ত্যাগ করতে! অর্থাৎ সালিহ (আঃ)-কেও তারা নবুওয়াতের আগে অনেক সম্মান করত, যেমনটা মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে মক্কার লোকেরা করত। সামূদ জাতির কাছে মু’জিযাস্বরূপ পাহাড় থেকে উটনী বের করে দেখানো হয়। তারা আপাতত নিবৃত হলে তাদের বলা হয় উটনীর কোনো ক্ষতি না করতে। কিন্তু উটনীকে পানি পান করানোর জন্য তাদের কিছুটা টান পড়ত বলে কতিপয় দুষ্ট লোক উটনীটি হত্যা করে। তিনদিন পর প্রচণ্ড শব্দের আকারে আযাব আসে। মুমিনগণ ছাড়া সামুদ জাতির সবাই এমনভাবে ধ্বংস হয়, যেন তারা সেখানে কোনোদিন বসবাসই করেনি।

    ইবরাহীম (আঃ) এর নিকট মানুষের রূপ ধরে কতিপয় ফেরেশতা আসেন। তাঁরা লূত (আঃ) এর কওম সাদ্দুমের জন্য আযাব নিয়ে নাযিল হয়েছেন বলে জানান। ইব্রাহীম (আঃ)এর স্ত্রী সারা (আঃ) তা শুনে আনন্দে হেসে দেন। তাঁদেরকে পুত্র ইসহাক (আঃ) ও নাতি ইয়াকুবের (আঃ) জন্মের আগাম সুসংবাদ দেওয়া হয়। সারা (আঃ) এই বৃদ্ধ বয়সে সন্তান হওয়ার খবর শুনে বিস্মিত হন। ফেরেশতাগণ জানান এটাই আল্লাহর হুকুম। ইবরাহীম (আঃ) তাঁর নরম দিলের কারণে সাদ্দুম নগরে এখনই আযাব না দেওয়ার ব্যাপারে অনুযোগ করেন। [অথবা ইবরাহীম (আঃ) লূত (আঃ) এবং অন্যান্য মুমিনদের ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাঁকে মুমিনদের রক্ষার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেয়া হয়। (আনক্বাবুত, ৩২)]  কিন্তু প্রতিশ্রুত সময় চলে আসায় আযাব নিশ্চিত হয়ে গেছে।

    লূত (আঃ) এর কাছে ফিরিশতাগণ সুদর্শন পুরুষ মেহমানরূপে এসেছিলেন। সাদ্দুমের লোকেরা মুশরিক হওয়ার পাশাপাশি পৃথিবীর প্রথম সমকামী জাতি ছিল। লূত (আঃ) তাঁর মেহমানদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কওমের লোকেরা খবর পেয়ে লূত (আঃ)-কে এসে হুমকি দিতে থাকে মেহমানদের তাদের হাতে তুলে দিতে। ফেরেশতারা লূত (আঃ) এর নিকট নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে ভোরবেলা আযাব আসার কথা বলেন। আর বলেন যে সেসব লোক কখনও তাঁর নিকট পৌঁছতে পারবে না। ভোরবেলা লূত (আঃ) সপরিবারে নগরী ছেড়ে চলে যান। তাঁর পরিবারের মাঝে শুধু তাঁর স্ত্রী আযাবে পাকড়াও হয়, কারণ সে ওইসকল পাপাচারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। সাদ্দুমের কওমকে আযাব হিসেবে ভূমিসহ উল্টে ফেলা হয় এবং আসমান থেকে পাথর বর্ষণ করে ধ্বংস করা হয়।

    মাদইয়ানের লোকেরা শির্ক করত। এছাড়া পথেঘাটে চৌকি বসিয়ে অন্যায়ভাবে পথিকদের থেকে টোল নিত বা লুটতরাজ করত। বেচাকেনার সময় মাপে কম দিত। শুআইব (আঃ) তাদের এসব ছেড়ে দিতে বলেন। হালালভাবে যা রিযিক অবশিষ্ট থাকবে, তাই যথেষ্ট। কাফিররা বলে, হে শুআইব! তোমার ধর্ম কি আমাদের বাপদাদার ধর্ম পালনে আর ব্যবসাবাণিজ্যে বাধা দিতে বলে? তুমি বেশি ভালোমানুষি দেখাচ্ছ। তোমার খান্দান প্রতিপত্তিশীল না হলে তোমাকে আমরা হত্যা করতাম (মুহাম্মাদ সাঃ-কেও তাঁর বংশ ও আত্মীয়দের ক্ষমতার ভয়ে মুশরিকরা ক্ষতি করার সাহস পেত না)। শুআইব (আঃ) আফসোস করেন যে, আল্লাহর ভয়ের চেয়ে আমার বংশের ভয়ই কি বেশি হয়ে গেল! অবশেষে সামূদ জাতির মতো আযাবে মাদইয়ানের কাফিররা ধ্বংস হয়।

    মূসা (আঃ) যখন ফিরআউন ও তার অমাত্যদের দাওয়াত দেন তখন ফিরআউনের মতো তার অমাত্যরাও ভ্রান্তির ওপর অটল থাকে। আখিরাতেও জাহান্নামে যাওয়ার সময় ফিরআউন তাদের নেতৃত্বে থাকবে।

    পূর্ববর্তী জাতিসমূহের প্রজ্ঞাবান লোকেরা নিজেরা ঈমান এনে অন্যদেরকেও হিদায়াতের পথে ডাকলে তারা সমূলে ধ্বংস হতো না।

    এভাবে পূর্বের নবী ও জাতিসমূহের বর্ণনা করা হয়েছে যা মুমিনদের জন্য শিক্ষাস্বরূপ। এসব জনপদের মাঝে কিছু জায়গায় এখনো লোক বসবাস করে, আর কিছু এমনভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত যে আর কখনো লোক বাস করেনি। নবী (সাঃ) ও মুমিনদের সালাত পড়ার ও নেককাজ করার হুকুম করা হয়।

    ১২। সূরা ইউসুফ, আয়াত ১ থেকে ৫২

    সূরা ইউসুফ প্রায় পুরোটাই ইউসুফ (আঃ) এর ঘটনা। বনী ইসরাইল কীভাবে শাম থেকে মিসরে গিয়ে বসবাস শুরু করল, তা এখান থেকে জানা যায়। ইউসুফ (আঃ) এর পিতা ইয়াকুব (আঃ) এর অপর নাম ইসরাইল, তাঁর পিতা ইসহাক (আঃ), তাঁর পিতা ইবরাহীম (আঃ)। ইয়াকুব (আঃ) এর এক স্ত্রী হতে দশ সন্তান, অপর স্ত্রী হতে দুই সন্তান (ইউসুফ ও বিন ইয়ামীন) জন্ম নিয়েছিল। এই বারোজন থেকে পরে বনী ইসরাইলের বারোটি গোত্র হয়।

    ইউসুফ (আঃ) স্বপ্নে দেখেন এগারটি নক্ষত্র এবং চাঁদ ও সূর্য তাঁকে সিজদা করছে। ইয়াকুব (আঃ)-কে এই স্বপ্নের কথা জানালে তিনি তা গোপন রাখতে বলেন এবং ভবিষ্যতে যে ইউসুফ (আঃ) নবী হবেন তার ইঙ্গিত দেন।

    সেই দশজন সৎভাই ইউসুফ ও বিন ইয়ামীনের প্রতি তাদের পিতার ভালোবাসা দেখে হিংসা করত। অথচ তারা বড় দল (বড় পরিবার মানে নিরাপত্তা ও আয়ের নিশ্চিততর উৎস, তাই তাদের আশা ছিল তারাই পিতার ভালোবাসার অধিক যোগ্য)। একদিন তারা ইউসুফ (আঃ)-কে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরে পরিকল্পনা পাল্টে কুয়োয় ফেলে দিতে মনস্থির করে। তারা ইয়াকুব (আঃ) এর কাছে গিয়ে খেলাধুলার কথা বলে ইউসুফ (আঃ)-কে নিয়ে যেতে চায়। ইয়াকুব (আঃ) বলেন তাদের অসাবধানতায় নেকড়ে ইউসুফকে (আঃ) খেয়ে ফেলার ভয় তিনি করেন। ছেলেরা তাঁকে আশ্বস্ত করে জোর করে নিয়ে যায়। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে তারা ইউসুফের জামায় নকল রক্ত মাখিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসে। বলে যে তারা ইউসুফকে মালপত্র হেফাজতের দায়িত্বে রেখে দৌড় প্রতিযোগিতা করার সময় নেকড়ে ইউসুফকে খেয়ে ফেলে। ইয়াকুব (আঃ) তাদের মিথ্যাচার বুঝতে পেরেও সবর করেন।

    এদিকে ইউসুফ (আঃ)-কে আল্লাহ দৃঢ় রাখেন, কুয়োর ভেতর তাঁকে জীবিত রাখেন। কোনো এক কাফেলা পানি তুলতে বালতি ফেললে তিনি তাতে করে উঠে আসেন। তারা তাঁকে দাস হিসেবে স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করে দেয়। মিশরের অর্থমন্ত্রী (উপাধি ‘আযীয) তাঁকে ক্রয় করে ঘরে রাখেন এবং নিজের স্ত্রীকেও তাঁর ভালো রক্ষণাবেক্ষণ করতে বলেন।

    একসময় আযীযের স্ত্রী ইউসুফকে মন্দ কাজে আহ্বান করে। ইউসুফ (আঃ) এর মনেও মানবীয় দুর্বলতা আসার উপক্রম হলেও আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেন। তিনি দরজার দিকে দৌড় দিলে আযীযের স্ত্রী তাঁকে ধরতে গিয়ে তাঁর জামা পেছন থেকে ছিঁড়ে ফেলে। এমন সময় আযীয চলে আসেন। আযীযের স্ত্রী ইউসুফের বিরুদ্ধে খারাপ কাজের অভিযোগ করে ভিক্টিম প্লে করতে থাকে।

    ইউসুফের (আঃ) জামা সামনে থেকে ছেঁড়া থাকলে বোঝা যেত তিনিই মন্দ কাজে আগে অগ্রসর হয়েছেন, নারীটি বাধা দিতে গিয়ে জামা ছিঁড়েছে। কিন্তু পেছনদিকে ছেঁড়া থাকায় আসল দোষী প্রকাশ পেয়ে যায়। আযীয ইউসুফের কাছে ক্ষমা চেয়ে স্ত্রীকে সাবধান করে পুরো বিষয় গোপন রাখতে চান।

    এদিকে ঘটনা চাউর হয়ে শহরের সম্ভ্রান্ত নারীদের মাঝে কানাকানি শুরু হয় যে আযীযের স্ত্রী তার দাসের প্রেমে পড়েছে। সে তা জানতে পেরে তাদের দাওয়াত করে ইউসুফকে কৌশলে সামনে আনায়। তাঁর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সেসব নারী ফল কাটতে গিয়ে নিজেদের হাত কেটে ফেলে। আযীযের স্ত্রী বলে এজন্যই সে তাঁকে ফুসলানোর চেষ্টা করেছিল। প্রত্যাখ্যান করার অপরাধে তাঁকে কারাগারে যেতে হবে। ইউসুফ (আঃ) দু’আ করেন এই গুনাহের পরিবেশের চেয়ে কারাগারই তাঁর অধিক প্রিয়।

    অবশেষে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিয়ে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। তাঁর সাথে আরো দুজন বন্দী ছিল। তারা ইউসুফের সুন্দর স্বভাব দেখে তাঁর কাছে নিজেদের দুটি স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চায়। তিনি এ সুযোগে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেন। তারপর স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানান যে তাদের একজন মুক্তি পেয়ে রাজার মদপরিবেশনকারীর চাকরি পাবে, আরেকজন মৃত্যুদণ্ড পাবে। যে মুক্তি পাবে সে যেন রাজার কাছে ইউসুফের জন্য সুপারিশ করে, এ কথা বলে দেন। কিন্তু লোকটি মুক্তি পাওয়ার পর সে কথা ভুলে যায়। ফলে ইউসুফ (আঃ) আরো কয়েক বছর কারাগারে থাকেন।

    রাজা এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে পরিষদবর্গের কাছে এর ব্যাখ্যা জানতে চান। তারা বলে এটা অর্থহীন। আর তাদের তো স্বপ্নের ব্যাখ্যার জ্ঞানও নেই। তখন মদপরিবেশনকারীর ইউসুফের (আঃ) কথা মনে পড়ে। তাকে পাঠানো হলে সে ইউসুফ (আঃ) এর কাছে হুবহু স্বপ্নের কথা তুলে ধরে। ইউসুফ (আঃ) আসন্ন সাত বছরের প্রাচুর্য ও পরের সাত বছরের দুর্ভিক্ষ এবং তা মোকাবেলার উপায় বলে দেন। রাজা ইউসুফের প্রজ্ঞার খবর পেয়ে তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ইউসুফ (আঃ) প্রথমে তাঁর বিরুদ্ধে মামলাকারীদের সাক্ষ্য নিতে বলেন। আযীযের স্ত্রীসহ ওই মহিলাগুলো তাঁর নির্দোষিতা স্বীকার করে। এভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করিয়ে তবেই তিনি জেল থেকে বের হন। বাকি ঘটনা পরের তারাবীহতে।

  • আজকের তারাবীহ: ৮ রমাদ্বান

    আজকের তারাবীহ: ৮ রমাদ্বান

    ০৯। সূরা তাওবাহ, আয়াত ৯৩ থেকে ১২৯

    মুসলিমরা তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পর যে মুনাফিকরা নিজেদের না যাওয়ার ব্যাপারে কসম করে ওজর পেশ করবে, তা জানিয়ে দেওয়া হয়। মুসলিমদের বলা হয় তাদেরকে বাহ্যিকভাবে উপেক্ষা করতে, যদিও আল্লাহ ঠিকই তাদের ওপর ক্রোধান্বিত।

    মদীনাবাসী এবং শহরতলীর বেদুইন উভয় শ্রেণীর লোকের মাঝেই মুনাফিক এবং সাচ্চা মুমিন আছে। এদের পার্থক্য বর্ণনা করা হয়।

    মদীনার এক খ্রিষ্টান পালিয়ে গিয়ে রোম থেকে মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা করছিল। তার সাহায্যার্থে মুনাফিকরা মসজিদের নাম দিয়ে একটি ইমারত তৈরি করে যা গোপন সলাপরামর্শ ও অস্ত্র মজুদের ঘাঁটি হিসেবে কাজ করবে। রাসূলকে (সাঃ) তারা বলে দুর্বল লোকদের কষ্ট কমাতে এটি তৈরি হয়েছে। তাঁকে অনুরোধ করে একদিন সেখানে নামাজ পড়াতে। তাবুকে যাওয়ার কথা বলে রাসূল (সাঃ) তা আপাতত এড়িয়ে যান। তাবুক থেকে ফেরার পথে এই ইমারতের গোমর ফাঁস করে আয়াত নাযিল হয়। পরে তা ধ্বংস করা হয়।

    আলসেমি ইত্যাদি কারণে জনাদশেক সাচ্চা সাহাবা তাবুক যুদ্ধে যেতে পারেননি। তাঁরা অত্যন্ত অনুতপ্ত হন। সাতজনের ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে ক্ষমা ঘোষণা করে আয়াত নাযিল হয়, কাফফারা হিসেবে তাঁরা যে সাদকা করেন, তা গ্রহণ করতে বলা হয়। তিনজনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত মুলতবি রাখা হয়। পুরো মুসলিম সমাজ ৪০ দিন যাবত তাঁদের বয়কট করে রাখে। এরপর তাঁদের স্ত্রীদেরও তাঁদের কাছ থেকে আলাদা থাকতে বলা হয়। তাঁদের একজন কা’ব বিন মালিক (রাঃ) এর এ ঘটনার বিস্তারিত একটি হৃদয়ছেঁড়া বর্ণনা আছে, যা তাফসির ও সীরাত গ্রন্থগুলোতে আছে। এ সময়ের মাঝে তাঁদের কাছে বহিঃশত্রুদের থেকে লোভনীয় প্রস্তাবও আসে। তাঁরা সেসব চিঠি পুড়িয়ে ফেলেন। তাঁরাও নিজেদের বিশ্বস্ততা ধরে রাখেন, মুসলিম সমাজও মনে মনে চায় আল্লাহ যেন তাঁদের মাফ করেন। ৫০ দিনের মাথায় তাঁদের ক্ষমার সুসংবাদ নিয়ে আয়াত নাযিল হয়।

    কাফির অবস্থায় মারা যাওয়া আত্মীয় স্বজনের জন্যও দু’আ করা নিষিদ্ধ করে আয়াত নাযিল হয়। ইবরাহীম (আঃ) যদিও তাঁর মুশরিক পিতার জন্য দু’আ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে যখন প্রকাশ হয়ে যায় তাঁর পিতা আল্লাহর শত্রু, তখন তিনি দু’আ করা থেকে বিরত হন।

    জিহাদের বিভিন্ন ফজিলত বর্ণিত হয়। মুজাহিদীন যত ক্ষুধা, তেষ্টা, কষ্ট ভোগ করেন, যত রাস্তা পার হন, যত পরিকল্পনা করেন, যত শত্রু হত্যা করেন, সব কিছুর জন্য সাওয়াব পান। আল্লাহর কাছে জান্নাতের বিনিময়ে জানমাল বিক্রয়কারী লোকদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয় তাঁরা আল্লাহর রাস্তায় শত্রুদের মারেন ও নিজেরা মরেন, তাওবাকারী, ইবাদতগুজার, রোজাদার, নামাজি, সৎ কাজের আদেশদাতা, মন্দ কাজের বাধাদানকারী।

    ফরজে কিফায়া জিহাদের ক্ষেত্রে সকলে একত্রে জিহাদে না গিয়ে একদল মানুষ ইল্ম চর্চায় রত থাকার নির্দেশ করা হয়।

    ১০। সূরা ইউনুস

    সূরা ইউনুসে অন্যান্য মাক্কী সূরাসমূহের মতোই মূলত তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত নিয়ে আলোচিত হয়েছে। আল্লাহ প্রথমবার সকল মাখলুক সৃষ্টি করেছেন, দ্বিতীয়বারও তিনি তা করতে সক্ষম।

    আল্লাহর সৃষ্টজগতের বিভিন্ন নিদর্শনাদি বর্ণনা করে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে বলা হয়। এসব নিদর্শনের ব্যাপারে উদাসীন কাফিরদের জন্য আছে জাহন্নাম। আর এসব সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তাভাবনাকারীরা বিশুদ্ধ তাওহীদে ঈমান আনার কারণে জান্নাতে যাবে।

    মানুষের ওপর ভ্রমণ বা অন্য কোনো অবস্থায় বিপদআপদ আপতিত হলে তারা শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ডাকে। আর বিপদ সরে গেলে এমন ভাব করে যেন আল্লাহকে তাদের কোনো দরকারই নেই।

    মুহাম্মাদ (সাঃ) নবুওয়াতের মিথ্যা দাবি করছেন বলে যারা দাবি করত, তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয় যে তিনি তো চল্লিশ বছর তাদের মাঝেই বসবাস চলাফেরা করেছেন। তাঁর সত্যবাদিতার ব্যাপারে তারা নিজেরাই সাক্ষী।

    মুশরিকরাও বিশ্বাস করত এ জগতের সৃষ্টিতে দেবদেবীর কোনো হাত নেই, আল্লাহই সব করেছেন। তারপরও ইবাদাত করার সময় ঠিকই তারা মনগড়া উপাস্যকে আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত বা সুপারিশকারী ভেবে পূজা করা শুরু করে।

    অনুকূল পরিবেশে নিশ্চিন্তে চলতে থাকা নৌযাত্রীদের ওপর দুর্যোগ এলে তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকতে থাকে। কিন্তু আল্লাহ বিপদ উঠিয়ে নিলেই তারা আবারও অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়।

    দুনিয়ার উপমা দেখানো হয় ফসলের ক্ষেত্রের মতো, যাকে উর্বর দেখে মানুষ নিশ্চিন্ত হয়ে এটাকেই সব ভেবে বসে থাকে। তারপর হঠাৎ কোনো এক দুর্যোগ এসে সব ফসল নষ্ট হয়ে যায়। দুনিয়াটাও এভাবে হঠাৎ কিয়ামাত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। সবাই নিজ নিজ কাজ অনুযায়ী আখিরাতে বদলা পাবে। কাফিররা তাদের মিথ্যা উপাস্যগুলোর কাছ থেকে কোনো সাহায্যই পাবে না। এসবকে তারা অনুমানের ভিত্তিতে বিশ্বাস করতে অথচ সত্যের বিপরীতে অনুমান কোনো কাজে আসে না।

    কাফিরদের ঠাট্টা উপহাসের বিপরীতে মুমিনদের সান্ত্বনা দিয়ে আখিরাতের প্রতিদানের কথা জানানো হয়েছে। কুরআনকে রোগের উপশম ও হিদায়াত আখ্যায়িত করা হয়েছে।

    প্রত্যেক জাতির কাছেই নবী রাসূল এসেছেন সত্য জানাতে। যখন তারা সীমালঙ্ঘন করেছে, তখন যথোচিতভাবেই নির্ধারিত সময়ে তাদের ওপর আযাব এসেছে। কারো ওপর যুলুম করা হয়নি। এভাবে এক জাতিকে ধ্বংস করে অন্য জাতিকে আনা হয় পরীক্ষা করার জন্য। আজ যারা জমিনে আছে, তারাও এই সিলসিলারই অংশ। মুমিন ও মুত্তাকীদের আল্লাহর বন্ধু (ওলী) আখ্যা দেয়া হয়।

    নূহ ও মূসা আলাইহুমাসসালাম এর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁদের যুগেও অনেকে নবীগণের সুস্পষ্ট নিদর্শন দেখেও ঈমান আনেনি। কাফিরদের পক্ষ থেকে নির্যাতনের ভয় থাকা সত্ত্বেও কিছু লোক ঈমান এনেছিলো। আল্লাহ কাফিরদের ধ্বংস করে মুমিনদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন। আযাব চলে আসার পর তা দেখে ফিরআউন ঈমান আনার ঘোষণা দেয়। কিন্তু আল্লাহ তা আর কবুল করেননি। ইউনুস (আঃ) এর কওম অবশ্য ব্যতিক্রম। তারা আযাবের লক্ষণ দেখে অনুতপ্ত হয়ে ঈমান আনে। আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে আযাব হটিয়ে দেন।

    এসব ঘটনা বর্ণনা করে মুশরিকদের ঈমান আনতে আহ্বান করা হয়। কারণ তারা যে বারবার প্রতিশ্রুত আযাব এনে দেখাতে চ্যালেঞ্জ করছে, সেই আযাব চলে আসলে তাদের আর ঈমান আনার সুযোগ হবে না।

    রাসূল (সাঃ) চাইলেই কাউকে জোর করে ঈমান আনাতে পারবেন না। মুসলিমরা তো নিজ কল্যাণের জন্যই আল্লাহর দ্বীনের অনুসরণ করবে। আর যারা মুখ ফিরিয়ে নিলো, শির্ক করলো, তারা নিজেদেরই ক্ষতি করলো।

    ১১। সূরা হুদ, আয়াত ১ থেকে ৫

    সূরা হুদে পূর্বেকার বিভিন্ন নবীর কওমের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত না করার দাওয়াত দিতে এই নবীগণ জান্নাতের সুসংবাদদাতা ও জাহান্নামের ব্যাপারে সতর্ককারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। যারা তাঁদের অমান্য করবে, তারা কিয়ামাতের দিন ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হবে। কাফিররা মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মুখে এসব কথা শুনলে মুখে কাপড় জড়িয়ে এমনভাবে সরে যেতো যেন আল্লাহকে ফাঁকি দিতে চাইছে, অথচ আল্লাহ গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছুর ব্যাপারে অবগত।