আজকের তারাবীহ: ২০ রমাদ্বান

৩৬। সূরা ইয়াসীন, আয়াত ২২ থেকে ৮৩

সেই ঈমানদার লোকটি তাওহীদের যৌক্তিকতা ও শির্কের অসারতা বলে ঈমান আনার ঘোষণা দেয়। তার কওম তাকে হত্যা করে ফেলে। মৃত্যুর পর সে পরকালের প্রতিদান পেয়ে আফসোস করে, হায়! আমার জাতি যদি জানত আল্লাহ আমাকে কী কী দিয়েছেন! আল্লাহ তার কওমকে বিনাক্লেশে আযাব দিয়ে ধ্বংস করে দেন।

আল্লাহর বিভিন্ন নিয়ামাত বর্ণিত হয়- মৃত ভূমিকে সজীব করে শস্য ও প্রস্রবণ তৈরি, প্রাণী-উদ্ভিদ ও মানুষের জানা-অজানা বহু জিনিস জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি, দিনরাত ও সূর্যচন্দ্র পরস্পরকে অতিক্রম করতে না পেরে নির্দিষ্ট নিয়মে আবর্তন, মানুষের জানা-অজানা বাহন। এ সবই নির্দিষ্ট কালের জন্য। আল্লাহ তা না দিলে আমরা এসব সৃষ্টি করতে পারতাম না, আল্লাহ এসব ধ্বংস করে দিলে আমরা বাঁচাতে পারব না।

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দানসদকা করতে বললে কাফিররা বলে, আমরা কি তাকে খাওয়াব যাকে আল্লাহ চাইলেই খাওয়াতে পারতেন? যখন কিয়ামাত হয়ে যাবে, তখন তারা এসব সম্পদ ব্যবস্থাপনার কোনো সময় পাবে না।

জান্নাতবাসীরা জান্নাতের নিয়ামাত ভোগ করবে, রবের পক্ষ থেকে তাদের সালাম দেওয়া হবে। আর কাফিররা শয়তানের আনুগত্যের মাধ্যমে তার উপাসনা করত বলে তিরস্কার করে তাদের জাহান্নামে পাঠানো হবে। আল্লাহ চাইলে ইহকালেই তাদের দৃষ্টি ও চলনক্ষমতা লোপ করে শাস্তি দিতে সক্ষম।

কাফিররা রাসূলকে (সাঃ) কবি বলে দাবি করত, এ অপবাদ খণ্ডন করা হয়।

আল্লাহর সৃষ্ট বিভিন্ন পশু থেকে মানুষ বিভিন্ন উপায়ে উপকৃত হয়, তারপরও তারা শির্ক করে।

সামান্য শুক্রবিন্দু থেকে সৃষ্ট মানুষ বড় হয়েই আল্লাহর ক্ষমতার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে থাকে! আখিরাতের পুনরুত্থান অসম্ভব বলে দাবি করে। অথচ আল্লাহ তাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, শুকনো গাছ থেকে আগুন প্রজ্জ্বলনের গুণ সৃষ্টি করেছেন। তিনি শুধু হওয়ার আদেশ করেন, আর তা হয়ে যায়।

৩৭। সূরা সফফাত

সূরা সফফাতের শুরুতে ফেরেশতা, আসমান, জমিন, নক্ষত্র ইত্যাদি সৃষ্টির উপমা দিয়ে মানুষকে প্রশ্ন করা হয়েছে- এসব যিনি সৃষ্টি করলেন, তিনি কেন আখিরাতে মানুষকে পুনর্জীবিত করতে অক্ষম হবেন?

আখিরাতে কাফিরদেরকে উপহাস করে জিজ্ঞেস করা হবে তারা কেন একে অপরকে সাহায্য করছে না। তাদের নেতা ও অনুসারীরা পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকবে। সকলেই শাস্তিতে নিক্ষিপ্ত হবে। তাদের খাদ্য হবে যাক্কুম গাছ ও তপ্ত পানি।

জান্নাতিরা থাকবে আতিথেয়তা ও পবিত্র সঙ্গীদের সাথে। দুনিয়াতে তাদেরকে কুফরের দিকে ডাকত, এরকম সঙ্গীদেরকে তারা জাহান্নামে দেখতে পাবে। তারা কথার ফাঁদে পড়েনি বলে আনন্দ করবে।

জাহান্নামের আগুনে গাছ থাকবে শুনে কাফিররা হাসিঠাট্টা করা শুরু করে। মূলত এ গাছের কথা উল্লেখ করাও তাদের জন্য একটি পরীক্ষা যে আল্লাহর ক্ষমতায় তারা বিশ্বাসী কিনা। তাদের বাপদাদারাও বিপথগামী মুশরিক ছিল, এর নিজেরাও সানন্দে সেই ভ্রান্তির অনুসরণ করছে। ফলে আজ জাহান্নামের কাঁটাযুক্ত ফল এবং ফুটন্ত পানিই হবে তাদের খাবার।

বিভিন্ন যুগে নবী ও মুমিনদের আল্লাহ কীভাবে রক্ষা করেছেন ও সম্মানিত করেছেন, তার কয়েকটি ঘটনা বর্ণিত হয়। নবীগণের নামের সাথে শান্তির দু’আ করা বা আলাইহিসসালাম বলার নিয়ম করে দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।

নূহ (আঃ) এর ঘটনা সংক্ষেপে বলা হয়। মূর্তিপূজক কওম কর্তৃক আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ষড়যন্ত্র থেকে ইবরাহীম (আঃ) এর মুক্তি, হিজরত ও সন্তান লাভের ঘটনা বর্ণিত হয়।

ইবরাহীম (আঃ) স্বপ্নে ওয়াহী পান যে ইসমাইল (আঃ)-কে যবেহ করতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি ইসমাইল (আঃ) এর মত জানতে চাইলে তিনিও আল্লাহর হুকুমের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করেন। উভয়ের আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ অন্য এক কুরবানির মাধ্যমে শিশু ইসমাইলকে রক্ষা করেন। অতঃপর ইবরাহীমকে (আঃ) আরেক পুত্র ইসহাক (আঃ) দান করেন।

মূসা ও হারুন (আঃ)-কে আল্লাহ কর্তৃক কিতাব প্রদান ও তাঁদের কওমকে মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করার কথা বর্ণিত হয়।

ইলইয়াস (আঃ) এর কওম বা’ল নামক মূর্তির পূজা করত। তিনি তাদের দাওয়াহ দেন। তাঁকে ও তাঁর অনুসারী মুমিনদের আল্লাহ রক্ষা করেন এবং বিরোধিতাকারীদের শাস্তি দেন।

লূত (আঃ) এর ধ্বংসপ্রাপ্ত কওমের বসতির নিকট দিয়ে মক্কাবাসীরা সফর ও যাতায়াত করে। তাদেরকে এ থেকে শিক্ষা নিতে বলা হয়।

ইউনুস (আঃ)-কে এক লাখের বেশি মানুষের কাছে নবী করে পাঠানো হয়। তারা ঈমান না আনায় তিনদিন পর আযাব আসার ঘোষণা দেওয়া হয়। আল্লাহর হুকুম আসার আগেই তিনি তাঁর কওমকে ছেড়ে চলে গিয়ে এক নৌযানে সওয়ার হন। নৌযান বেশি বোঝাই হওয়ায় বারবার লটারি করা হয় কোনো একজনকে ফেলে দেওয়ার ব্যাপারে। বারবার ইউনুস (আঃ) এর নাম আসে। এমন নেক লোককে কেউ ফেলতে চাইছিল না। কিন্তু ইউনুস (আঃ) স্বীকার করেন তিনি আল্লাহর একটি হুকুমের অন্যথা করেছেন বলে আল্লাহই এ ফলাফল দেখাচ্ছেন। তাঁকে পানিতে নিক্ষেপ করার পর মাছ তাঁকে গিলে ফেলে। দু’আ ইউনুস নামে যা আমরা চিনি, তা পাঠ করার কারণে আল্লাহ তাঁকে মুক্তি দিয়ে একটি ভূমিতে ফেলেন এবং সেখানে তাঁর জন্য উৎকৃষ্ট রিযকের ব্যবস্থা করেন। এদিকে তাঁর কওম আযাবের লক্ষণ দেখে অনুতপ্ত হয়ে ঈমান আনে, ফলে তাদেরকেও আল্লাহ মাফ করে দেন।

মুশরিকরা ফেরেশতা ও জিনদের সাথে আল্লাহর আত্মীয়তায় বিশ্বাস করে। এই শির্কি বিশ্বাসকে খণ্ডন করা হয়। জিনেরাও তো মানুষদের মতো বিচারের সম্মুখীন হবে। আর ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশে সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন কাজে লিপ্ত আছেন।

৩৮। সূরা সোয়াদ

সূরা সোয়াদের শুরুতে নবুওয়তের বিষয়ে মক্কার কাফিরদের কতিপয় আপত্তির খণ্ডন করে বলা হয়েছে, তারা আগেকার বড় বড় নাফরমান জাতিগুলোর মাঝে ক্ষুদ্র একটি দল যারা নিজ বসতভূমিতেই একদিন পরাজিত হবে।

রাসূল (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দিয়ে পূর্বের কতিপয় নবীর ঘটনা জানানো হয়। দাউদ (আঃ) এ ছিলেন বিজ্ঞ বিচারক। একবার বিবাদমান দুই ব্যক্তি তাঁর কাছে মামলা নিয়ে আসে। তাদের মাঝে আপাত বৈষম্য দেখে দাউদ (আঃ) দুর্বলতর লোকের পক্ষে রায় দেন। এরপর বুঝতে পারেন যে, এ বিচারটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক পরীক্ষা ছিল। এক পক্ষের বক্তব্য শুনে রায় দিয়ে দেওয়া উচিত হয়নি। তিনি তৎক্ষণাৎ তাওবা করে ফেলেন।

সুলাইমান (আঃ) ছিলেন প্রাচুর্য ও বিপদ উভয় অবস্থায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায়কারী এবং তাঁর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনাকারী। আল্লাহ তাঁকে বাতাস ও জ্বীনের ওপর নিয়ন্ত্রণ দেন, এমন রাজত্ব আর কাউকে দেওয়া হয়নি।

আইয়ুব (আঃ) দীর্ঘদিন রোগে জর্জরিত থেকেও সবর করেন ও দু’আ করেন। আল্লাহ তাঁকে গোসল ও পান করার জন্য মু’জিযা স্বরূপ পানি দান করেন এবং আগের চেয়েও বেশি পরিবার ও সম্পদ ফিরিয়ে দেন। শপথ পূর্ণ করার ও বিশেষ অবস্থায় শপথের কাফফারা আদায়ের নির্দেশ করা হয়।

ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব, ইসমাইল, আলইয়াসা, যুলকিফল আলাইহিমুসসালাম এর কথা বলা হয়।

জান্নাতবাসীদের জান্নাতি নায নিয়ামাত এবং কাফিরদের জাহান্নামের কষ্টের বর্ণনা দেওয়া হয়। কাফিররা একে অপরকে দোষারোপ করবে। দুনিয়ায় যেসব মুমিনদের ঠাট্টা করত, তাদেরকে জাহান্নামে দেখতে না পেয়ে বিস্মিত হয়ে যাবে।

আদম (আঃ) এর সৃষ্টি, ইবলীসের সেজদা করতে অস্বীকৃতি ও অহংকার, বিতাড়িত হওয়া, আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের ছাড়া কিয়ামাত পর্যন্ত সকলকে পথভ্রষ্ট করার ওয়াদা, আল্লাহ কর্তৃক শয়তান ও তার অনুসারীদের দ্বারা জাহান্নাম ভর্তি করার ওয়াদা পর্যন্ত ঘটনা বর্ণিত হয়।

নবীগণ কোনো পারিশ্রমিক চান না, মানুষের নিজেদের কল্যাণের জন্যই তাঁদের অনুসরণ করা উচিত।

৩৯। সূরা যুমার, আয়াত ১ থেকে ৩১

সূরা যুমারের শুরুতে মুশরিকদের কয়েকটি আকিদা খণ্ডন করা হয়- দেবদেবীর সুপারিশক্ষমতা এবং আল্লাহ কর্তৃক সন্তানগ্রহণ।

গবাদি পশু আল্লাহরই পক্ষ থেকে মানুষের জন্য নিয়ামাত। তিনিই মানুষকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, মাতৃগর্ভে হ্রাস-বৃদ্ধি তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন। আল্লাহ বান্দার মুখাপেক্ষী নন, বান্দারা তাঁর মুখাপেক্ষী। বান্দারা বিপদে পড়ে আল্লাহকে একনিষ্ঠ হয়ে ডাকে, আল্লাহ তাদের উদ্ধার করার পর শির্ক করে বসে। এসব মুশরিক কখনোই বিশুদ্ধ তাওহীদবাদীর সমান হতে পারে না। এদের মাঝে ন্যায়বিচারের জন্য আখিরাতের অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবী।

মুমিনদের হিজরত করতে উৎসাহিত করা হয়। এতে অভাব অনটন হতে পারে বটে। কিন্তু দুনিয়ায় বিত্তবান হলেও আখিরাতে যদি ব্যর্থ হতে হয়, এটাই আসল ব্যর্থতা। এরকম লোকদের জন্য আখিরাতে উপর-নিচ থেকে আগুন গ্রাস করার জন্য আসবে। সবুজ ফসল যেভাবে কোনো রোগ বা দুর্যোগে হলুদ হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়, কাফিরদের দুনিয়ার আনন্দ এভাবে শেষ হয়ে যাবে। আর যারা তাগুতকে বর্জন করে এক আল্লাহ অভিমুখী হয়, তারা জান্নাতে উঁচু উঁচু অট্টালিকায় থাকবে। দুইজন দাসের উপমা দেওয়া হয়। একজন পরস্পর বিরূপ ভাবাপন্ন একাধিক মালিকের অধীনে। আরেকজন একজন মালিকেরই অধীনে। এই দুইজনের মাঝে শেষের জনই ভালো অবস্থায় আছে। মুশরিক ও মুসলিমদের পার্থক্যও এমনই।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *